যমুনা নদী এখন ধু-ধু বালুর চর। নদীর বুকজুড়ে জেগে ওঠা বিশাল চরের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক নৌযোগাযোগ, চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদী পাড়ের হাজারো মানুষ। যমুনায় পানি না থাকায় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। নাব্য সংকটে চাহিদা মতো পাওয়া যাচ্ছে না মাছ। যমুনা গতিপথ হারিয়ে এক দিকে যেমন সর্বস্বান্ত করেছে চরাঞ্চলের মানুষকে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হচ্ছে মরা খালে। যাত্রী পরিবহনে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নৌকার মাঝিদের। নদী শাসনের দাবি জানিয়েছে নদী পাড়ের মানুষ।
৯০ দশকে পূর্ণ যৌবন ছিল যমুনা নদীর। যমুনা নদীতে চলত স্টিমার, ফেরি, লঞ্চ, জাহাজসহ নানা ধরনের নৌপরিবহন। টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জ হয়ে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল এ যমুনা নদী। বড় বড় ঢেউয়ের তোড়ে ফেরি বা স্টিমারের মতো ভারী নৌযানও থমকে যেত। নদী তীরের মানুষ আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাত। অথচ কালের আবর্তনে সেই যমুনা এখন শুকিয়ে একটি শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। নদী বেষ্টিত জেলার কাজীপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুরে বিভিন্ন পয়েন্টে বিশাল বিশাল এলাকাজুড়ে বালুচরে পরিণত হয়েছে।
যমুনা নদীর ইলিশ, বোয়াল, আইড়, চিংড়ি, পাবদা, রুই, কাতলা মাছের চাহিদা ছিল দেশজুড়ে। কিন্তু যমুনায় পানি না থাকায় দেশীয় প্রজাতির এসব মাছ চাহিদা মতো পাওয়া যাচ্ছে না। নদীর নব্য কমায় ও দ্রুত পানি শুকিয়ে যাওয়ায়, দেখা মিলছে না এসব মাছের। ফলে নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করত তারা আজ পেশায় নিয়োজিত করছে নিজেদের। দীর্ঘদিন ধরে নদী শাসন না হওয়ায় গতিপথ পরিবর্তন হয়ে শুষ্ক মৌসুমে যমুনা বালুচরে রূপ দিয়েছে। চরের মানুষ নৌকাযোগে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করলেও সেখানে আজ পথ হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। মাইলের পর মাইল হেঁটে আর অনেক দূর ঘুরে যেতে হচ্ছে গন্তব্যে। মালামাল পরিবহনে একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি।
তবে কিছুটা আশার বাতিঘর হয়ে আছে নদীর তলদেশে জমে থাকা শত শত একর পলিপড়া জমি। এসব জমি এখন কৃষকদের জন্য সবুজের মাঠে পরিণত হয়েছে। চরে চাষ হয়েছে ভুট্টা, বাদাম, সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন, টমেটো, তিল, ধান, মরিচসহ নানা ফসল। এসব ফসল চাষ করে চরাঞ্চলের মানুষ সংসারে সচ্ছলতা এনেছে। কাওয়াকোলা চরের নজরুল ইসলাম বলেন, সারা বছর আমাদের যাতায়াতে কষ্ট করতে হয়। নদীর অধিকাংশ জায়গাজুড়ে বিশাল বিশাল বালুর চর। পানি কমে নদী শুকিয়ে গেছে। বলতে গেলে পানি সারা বছর ছিলই না। ২০ মিনিটের পথ দেড় ঘণ্টা ঘুরে যেতে হয়। মালামাল নিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ নদীতে ৯০ দশকেও লঞ্চ, ইস্টিমার, জাহাজ চলাচল করত। যমুনা সেতু হওয়ার পর এগুলো চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পানি না থাকায় মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। নদীতে ড্রেজিং করতে হবে। তা না হলে সারা বছর চরবাসীকে কষ্ট করতে হবে।
জহুরুল ইসলাম মাছ শিকারী বলেন, যমুনা নদীতে ইলিশ, বোয়াল, আইড়, চিংড়ি, পাবদা, রুই, কাতলা মাছ পাওয়া যেত। এখন ঠিক মতো পাওয়া যায় না। নদীতে পানি নেই। যেটুকো আছে, চর পড়ে নালা তৈরি হয়েছে। নদীতে পানিপ্রবাহ নেই। রাতভর কষ্ট করে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যায় না। কিছু দেশীয় ছোট মাছ পাওয়া যাচ্ছে।
শহররক্ষা বাঁধ এলাকায় নৌকার মাঝি ফরিদুল ইসলাম বলেন, কাওয়াকোলা চর থেকে ভুট্টা নিয়ে শহরে এসেছি। নদীতে পানি নেই। অনেক দূর ঘুরে আসতে হয়েছে। এতে সময় লেগেছে বেশি। খরচও লাগছে বেশি। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ এলাকায় প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৩০ হাজার কিউসেক পানি সর্বোচ্চ প্রবাহিত হয়। শুষ্ক মৌসুমে ১০ পার্সেন্টে নেমে আসে। মাঝে-মধ্যে তিন হাজার কিউসেক পানি নেমে আসে। পাহাড়ি এলাকা দিয়ে যমুনা নদীর পানি আসে। পাহাড়ি এলাকায় ঢাল অনেক বেশি থাকে। পানির সঙ্গে মাটি-বালু নিয়ে আসে। প্রতি বছর এ এলাকায় তিন হাজার টিলিয়ন টন পলি জমা হয়। যে কারণে বিশাল বিশাল এলাকাজুড়ে বালুচরে পরিণত হয়। এ পলি অপসারণ করার মতো ক্যাপাসিটি আমাদের নেই। সরকার যদি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পলি অপসারণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে, তাহলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন সম্ভব। প্রতি বছর ড্রেজিং করতে হবে। তাহলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা হবে না এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীতে চর পড়বে না।