হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

এতিমখানার নামে ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ, তদন্তে নেই অগ্রগতি

উপজেলা প্রতিনিধি, কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ)

ধুলো জমে থাকা দরজায় তালা ঝুলছে, বারান্দায় স্তূপ করে রাখা খড় আর লাকড়ি। ভেতরে নেই কোনো শিশুদের কোলাহল, নেই শিক্ষকের উপস্থিতি। অথচ সরকারি নথিতে এখানেই নাকি প্রতিনিয়ত চলছে এতিমখানার কার্যক্রম। নেই এতিম, তবু প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার বরাদ্দ আসে আর উত্তোলনও হয় নিয়মিতভাবে।

এতিমখানাটি সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মাইজবাড়ি ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামে 'মোহাম্মদ আলী শিশু সদন'। চকপাড়া দারুল উলুম হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসা সংলগ্ন এতিমখানাটি, যার রেজি নংসিরাজ-৩৯৬/৯৬।

এ শিশু সদনে ভুয়া এতিম শিশু দেখিয়ে ভুয়া বিল ভাউচার দাখিল করে বরাদ্দের টাকা প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সমাজসেবা কার্যালয়ের কতিপয় ব্যক্তির পকেটেই ঢোকে।

ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা তদন্তকাজ শুরু করেছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্ত কমিটির কাজে কোনো অগ্রগতি নেই।

সম্প্রতি এতিমখানাটিতে গিয়ে দেখা গেছে দরজায় তালা। বারান্দায় খড় ও লাকড়ির গাদা। ঘরের জানালা দিয়ে ভিতরে দেখা গেল একটি বড় ব্যানার ঝোলানো। পরিত্যক্ত পড়ে আছে এতিমখানার ঘরটি। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি এতিমখানা। কোনো এতিম বা শিক্ষকের দেখা মেলেনি। একেবারে পরিত্যক্ত বহু দিন ধরে।

কাজিপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করেছেন এতিমখানা কমিটি। তিন অর্থবছরে এতিমপ্রতি ২০০০ টাকা হিসেবে ২০ জন এতিমের জন্য বরাদ্দ হতো প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মোট ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও ভাড়াটে এতিম ও ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে প্রথম কিস্তির বরাদ্দের টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন কমিটির লোকজন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সে বরাদ্দের টাকা স্থগিত করে উপজেলা সমাজসেবা অফিস।

নিয়ম রয়েছে, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে বেসরকারি এতিমখানা কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত কমিটির স্বাক্ষরিত নিবাসী এতিমদের তালিকা ও ব্যয়ের বিল ভাউচার দাখিল করবেন।

সমাজসেবা কর্মকর্তা ওই এতিমখানার নিবাসী এতিম শিশুর সংখ্যা, কমিটির মেয়াদ যাচাই-বাছাই করে এতিম শিশুর খাওয়া, পোশাক ও চিকিৎসার ব্যয় বিল ভাউচার অনুমোদন দেবেন। বেসরকারি এতিমখানায় অবস্থানরত এতিমের মোট সংখ্যার সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ডের জন্য বিবেচিত হবে।

নিয়মিত এতিমখানা পরিদর্শন করে সেই এতিমদের জন্য বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু 'মোহাম্মদ আলী শিশু সদন' এখন পর্যন্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা পরিদর্শনই করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে কাজিপুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবুল কালাম আজাদ নামের এক ইউনিয়ন সমাজকর্মী ছিলেন, যার বাড়ি ওই চকপাড়া গ্রামেই। তার বাড়ির পাশেই এতিমখানার অবস্থান। অফিসের কাজ তিনিই সব ম্যানেজ করতেন। অবসরের পর সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন।

এতিমখানার পাশের বাড়ির বাসিন্দা মতলেব নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘এই যে এহিন দিয়া যাওয়া আসা হরি ৪-৫ বছর ধইরা কোনো এতিম দেহি না। এতিমখানা খোলাও দেহি না। কিন্তু টেহা তুইলা কারা কারা বলে খায়।’

আসাদুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, এখানে করোনার সময় থেকে কোনো এতিম নাই। কিন্তু হালিম হুজুর তার মাদ্রাসার ছাত্র নিয়ে এসে ভিডিও করে সেই ভিডিও দেখিয়ে টাকা তোলেন।

বাদুল্লি নামের আরেক মুরুব্বি বলেন, ‘আমার বাড়ি এই জাগাতই। এহিনেই আমরা সবসময় বইসা থাকি। এহিনে যে এতিম ছলপল খাওয়াদাওয়া করে তা আমরা দেহি নাই। কয়েক বছর ধইরা এতিমখানা বন্ধ, তালা দেওয়া।'

দুদু নামের স্থানীয় আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘৩-৪ বছর হলো এখানে কোন এতিম নাই। এতিমখানা চলতেছেও না, সবকিছু বন্ধ আছে।’

জয়নাল নামের এক ব্যক্তি বলেন, 'নিজেরাই কমিটি গঠন করেছে। মাইজবাড়ি পরিষদের পাশে অবস্থিত হালিমের মাদ্রাসা থেকে ছাত্র নিয়ে এসে ছবি তুলে সেই ছবি জমা দিয়ে কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক টাকা উত্তোলন করেছে। অথচ এতিমখানা বন্ধ অনেক দিন ধরে। কোনো এতিম বা শিক্ষক নাই।

এতিমখানা সংলগ্ন চকপাড়া দারুস সালাম কওমি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ বলেন, পাঁচ ছয় বছর ধরে এতিমখানায় কোনো এতিম নেই। আমাদের মাদ্রাসার কয়েকটা ছাত্র ছিল, তাদের এতিম দেখিয়ে যখন টাকা তোলে, কমিটির লোকজন তখন মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছে।

এতিমখানা কমিটির সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘এই মাদ্রাসায় আমরা জমি দিছি। টাকা তুলছি। বাকি আছিল সব পরিশোধ করছি। এতিমখানার জন্য মেলা কেনাকাটা করছি।' এতিমখানায় এতিম নেই, তবু টাকা তুলেছেন কেন জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমাকে সময় দেন, এতিম নিয়ে আইসা দিমু।’

এতিমখানার সাধারণ সম্পাদক ও কুনকুনিয়া আল-ফালাহ নূরানিয়া হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা আব্দুল খালেক বলেন, ‘২০২১ সালের পরে আসলে এতিম নাই। এতিম ভর্তি আছে। আমাকে সময় দিলে সব হাজির করতে পারবো। আপনার মাদ্রাসার ছাত্রকে এতিম দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করেছেন কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন উত্তরই দেননি। বলেন, আমার কাছে সব কাগজপত্র আছে। ফয়সাল স্যার তদন্ত করতেছে, তার কাছে সব কাগজ জমা দিছি। তিনিই সব দেখবেন, আপনারা দেখার কেউ না।

তদন্ত কমিটির প্রধান কাজিপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ বলেন, 'বেশ কিছু দিন আগে আমাদের তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। ব্যস্ততার কারণে তদন্ত শুরু করতে একটু দেরি হয়ে গেছে। আমরা এতিমখানায় গিয়েছিলাম, এতিম পাইনি। পরিত্যক্ত অবস্থায় এতিমখানাটি। আমরা সত্যটাই প্রতিবেদন আকারে জমা দেবো।'

কাজিপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সোহেল রানা বলেন, আমরা আসলে পরিদর্শন করতে পারিনি। সিরাজগঞ্জ থেকে এসে এখানে সপ্তাহে একদিন অফিস করি। তদন্ত কমিটি তদন্ত করে যদি সম্পৃক্ততা পায় আমার শাস্তি হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে সোমবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সিরাজগঞ্জের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান খান বলেন, বিষয়টি দেখতেছি। তবে সমাজসেবা কার্যালয়ের গাফিলতি বা অভিযুক্ত কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সিরাজগঞ্জে নদীর পাশ থেকে অটোভ্যান চালকের লাশ উদ্ধার

ইজিবাইকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আলিম পরীক্ষার্থীর মৃত্যু

নওগাঁয় চার হত্যাকাণ্ড: ভাগিনা আটক, তিনজন পুলিশ হেফাজতে

রাজশাহী নার্সিং কলেজে তালা মেরে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি

সিরাজগঞ্জে বালু উত্তোলনে যমুনার তীর সংরক্ষণ এলাকায় ভাঙন

মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

রামেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত

রাজশাহীতে লোডশেডিং, বিপর্যস্ত জনজীবন

নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যা

দিনে তিনবার তেল সংগ্রহ, যুবকের কারাদণ্ড