রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সংকটে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কঠোর মন্তব্যের পরও এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
গত শনিবার দুপুরে রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে ‘সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ’ (এসওএসবি) আয়োজিত ‘সিএমই অন মেডিকেল এথিকস’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১১ দিনে আমার ৩৩টি শিশু মারা গেছে। রাজশাহীর ওই পরিচালক আমাদের জানায়নি যে তার ভেন্টিলেটর নেই, নিউনেটাল ভেন্টিলেটর নেই, তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো উচিত। মন্ত্রীর এই মন্তব্য সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি নিজেই রামেক হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু সেখানে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাননি। বরং পরিচালক প্রথমে বিষয়টিকে ‘মিডিয়ার বাড়াবাড়ি’বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের কোনো অংশই অস্বীকার করতে পারেননি বলে জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রীর কঠোর মন্তব্যের পরদিন গতকাল রোববার রামেক হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, পরিচালক মাসুদ উল ইসলাম স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন। সকাল ৮টা ৩ মিনিটে তিনি হাসপাতালে প্রবেশ করেন। পরে সকাল ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে বৈঠক করেন। এরপর বেলা সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে কনফারেন্স রুমে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তবে বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কেউ মুখ খোলেননি। পরিচালকের পক্ষ থেকেও এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে আজ সোমবার বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি জরুরি জুম মিটিং ডাকা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনীয় আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটরের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে নবজাতকদের জন্য পর্যাপ্ত নিউনেটাল ভেন্টিলেটর না থাকায় সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসক ও নার্সদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে একের পর এক শিশুর মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে একজন হাসপাতাল পরিচালকের প্রধান দায়িত্ব হলো দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হওয়া। কিন্তু সেই জায়গায় গাফিলতির অভিযোগ ওঠায় পুরো ব্যবস্থাপনাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এদিকে, এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে একজন মন্ত্রী এত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছেন, সেখানে কেন এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? প্রশাসনের এই নীরবতা কি কোনো অদৃশ্য চাপের ইঙ্গিত, নাকি এটি কেবলই দায় এড়ানোর চেষ্টা?
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্যখাতে মানুষের আস্থা আরো কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন সংকট মোকাবিলায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা জরুরি।