হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

সরকারনির্ধারিত দাম না পেয়ে ক্ষতির মুখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

ফাইল ছবি

পবিত্র ঈদুল আজহার পর রাজশাহী অঞ্চলে দেশের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার মোকামে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সংগ্রহকেন্দ্রে এখন চলছে কেনাবেচার ধুম। নগরী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত চলছে চামড়া সংগ্রহ, লবণজাতকরণ ও গুদামজাতের ব্যস্ততা। তবে স্বস্তির হাসি নেই ব্যবসায়ীদের মুখে। সরকারনির্ধারিত দাম না পেয়ে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে চামড়ার দরপতন ও ক্রেতার সংকট।

গত রোববার সকালে নাটোর শহরের চকবৈদ্যনাথ চামড়া মোকাম ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ট্রাক, ভ্যান ও ছোট যানবাহনে করে গরু ও ছাগলের চামড়া নিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেকেই চামড়া বিক্রি না করে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার লোকসানে বাধ্য হয়ে বিক্রি করছেন।

মোকাম-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নাটোরের এ মোকামে প্রায় ১২ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঈদের দিন বিকাল থেকেই চামড়া আসতে শুরু করে। ঈদের পরের দিন থেকে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল চামড়া আসে। আকার ও মানভেদে লবণযুক্ত ভালো গরুর চামড়া ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং লবণবিহীন ভালো চামড়া ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ দাম কেবল কিছু উন্নতমানের চামড়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বাস্তবে বেশিরভাগ চামড়া অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

বাগমার থেকে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ৩০টি খাসির চামড়া নিয়ে এসেছিলাম। ভালো দাম পাব ভেবেছিলাম, কিন্তু চামড়াগুলো রেখে মাত্র ২০০ টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে পরিবহন খরচও উঠবে না। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারী মো. মামুন বলেন, ৩০টি চামড়ার মধ্যে অর্ধেক পচে গিয়েছিল। সে অনুযায়ী দাম দেওয়া হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন আড়তগুলোতে খুব কম দাম বলছে। এ দামে বিক্রি করলে মূলধনই ফেরত আসবে না।

রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও এর চেয়েও কম দামের অভিযোগ রয়েছে। অথচ কয়েক বছর আগেও একই ধরনের একটি গরুর চামড়া এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হতো। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র সংগ্রাহক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার বাজার প্রায় ক্রেতাশূন্য।

স্থানীয় একটি কওমি মাদরাসার প্রতিনিধি হাফেজ কাউসার আলী বলেন, ৩৫টি গরু ও ২০০টি ছাগলের চামড়া ৩১ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। আড়তদারি ও পরিবহন খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। কোরবানির সময় চামড়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এর পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে আমাদের ধারণা।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংগ্রহের পর দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। এতে লবণ, শ্রমিক, পরিবহন ও গুদামজাতকরণে বড় অঙ্কের ব্যয় হয়। কিন্তু বিক্রির সময় সেই ব্যয়ও উঠে আসে না।

রাজশাহীর রেলগেট এলাকায় চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে কথা হয় ব্যবসায়ী টিটু ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, চামড়া কিনে সংরক্ষণ করতে প্রচুর খরচ হচ্ছে। কিন্তু বিক্রির সময় সে অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন না হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

অন্যদিকে আড়তদারদের দাবি, নিম্নমানের ও লাম্পিস্কিন রোগে আক্রান্ত চামড়া বেশি আসায় অনেক ক্ষেত্রে দাম কম পাওয়া যাচ্ছে। আড়তদার রকিব উদ্দিন বলেন, চামড়ার দাম কম দেওয়া হচ্ছে, এমন অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। ভালো মানের চামড়ার জন্য আমরা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছি। কিন্তু কাটা, ক্ষতিগ্রস্ত বা লাম্পিস্কিন আক্রান্ত পশুর চামড়ার দাম তো স্বাভাবিকভাবেই কম হবে।

আড়তদার নাসিম খান বলেন, সব চামড়ার মান এক নয়। লবণযুক্ত ও লবণবিহীন চামড়ার দামের পার্থক্য থাকবেই। অনেক চামড়ায় পর্যাপ্ত লবণ দেওয়া হয়নি। ফলে সেগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম সিদ্দিকী বলেন, ত্রুটিপূর্ণ চামড়ার বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। ভালো চামড়ার জন্য উপযুক্ত দাম দিতে ব্যবসায়ীদের কোনো আপত্তি নেই। তবে চামড়া কেনার সময় গুণগত মান যাচাই করা জরুরি।

রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি লুৎফর রহমান বলেন, এবার চামড়ার বাজার অনেক দুর্বল। গুণগত মান অনুযায়ী ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। এখনো অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীর কাছে চামড়া রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাজারের প্রকৃত অবস্থা আরো পরিষ্কার হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চামড়াশিল্প দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে রয়েছে। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা, ট্যানারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকায় প্রতি বছর একই সমস্যা দেখা দেয়।

অর্থনীতিবিদ আনোয়ার হোসেন বলেন, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে সংগ্রহকারী, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সমন্বিত বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

চামড়া ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন মনে করেন, চামড়া বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মান নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্যের কারণে প্রকৃত সংগ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এদিকে সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের আশঙ্কা থাকলেও প্রশাসন বলছে, এবার তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগেই চামড়া পাচার রোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত চামড়া পাচারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসন ও বিজিবি এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছে।

চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির পশুর চামড়া ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে মৌসুমি ব্যবসায়ী, এতিমখানা, মাদরাসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাজারে স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি এবং সরকার ঘোষিত দাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সম্ভাবনাময় খাতকে রক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বগুড়ায় চিকিৎসকের অবহেলায় গৃহবধূর মৃত্যু, পালিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

সিরাজগঞ্জে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ, ভোক্তা অধিদপ্তরের জরিমানা

ভাঙ্গুড়ায় নিখোঁজের ৩ দিনেও সন্ধান মেলেনি শিশু জিহাদের

ধামইরহাটে ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেল চালক নিহত

শহীদ জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র পেয়েছি: দুলু

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সবাই গুপ্ত জামায়াত: হারুনুর রশিদ

লালপুরে তাপমাত্রা ৩৭.৭ ডিগ্রি, ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস জনজীবন

যমুনা নদী থেকে শিকল বাঁধা যুবকের লাশ উদ্ধার

সিংড়ায় ট্রাক চাপায় তিন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

তাড়াশে বালিকা বিদ্যালয়ের সীমানা বেড়া ভাঙচুর, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ