ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের পীরগাছায় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা) নিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ উপজেলায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে নন এমপিওভুক্ত শিক্ষক, বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মচারী, সাবেক ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। অভিযোগে জানা গেছে, প্রথম শ্রেণির (নবম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড) শিক্ষক-কর্মকর্তা প্রায় ৩০০ জন থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৯০ জন প্রিসাডিং কর্মকর্তা নিয়োগে দ্বিতীয় শ্রেণি ও প্রকল্পের ১৫ জন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ গ্রেডের কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনকে চৌধুরাণী উচ্চ বিদ্যালয়ে, আব্দুস সালামকে মকরমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মকুল চন্দ্র রায়কে তালুককান্দি হাজি মহসিনিয়া দাখিল মাদরাসায় এবং নুরুজ্জমান মিয়াকে চৌধুরানী ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাণিসম্পদ বিভাগের এলডিডিপি প্রকল্পের তৌহিদুল ইসলামকে পাঠক শিকড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুল আলমকে পারুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও অন্নদানগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনকে দুদিয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
চর রহমত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুবাস চন্দ্রের বিরুদ্ধে জ্বাল সনদে চাকুরি অভিযোগে তদন্ত চলমান রয়েছে। তাকে বালাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যাল কেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ নেতার ছোট ভাই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমানকে বিহারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, আওয়ামী লীগ নেত্রী জেসমীন বেগমকে বড় দরগা উচ্চ বিদ্যালয়ে, আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম রেজাকে সিদামহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যক্ষ্মা প্রকল্পের এমটি ল্যাব আফসানা আক্তারকে শরিফ সুন্দর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে, প্রাণিসম্পদের এলডিডিপি প্রকল্পের মাজহারুল আল আমিনকে মহিষমুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, পল্লি দারিদ্র বিমোচন প্রকল্পের রেজওয়ান খাতুন, শাহীনুর ইসলাম, মোস্তাফিজার রহমান, এলডিডিপি প্রকল্পের এলএফএ ফাসিউল ইমলাম ও ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের রেবা আক্তারকে পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কম্পিউটার অপারেটর আনোয়ারুল ইসলাম, কমিউনিটি অর্গানাইজার শ্যামলি বেগম, নন এমপিও ভুক্ত শিক্ষক পঙ্কজ কুমার রায় ও আব্দুল আখেরকে পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
বিআরডিবি প্রকল্পের আনোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা লুৎফর রহমান ও ইটাকুমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ফারুক আহমেদকে সহকারী শিক্ষক দেখিয়ে পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া প্রশিক্ষণরত শিক্ষক ও অসুস্থ শিক্ষকদেরও জোরপূর্বক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে বিতর্কিত কর্মকর্তাদেরও এই নির্বাচনে কৌশলে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার ফারুকুজ্জামান ডাকুয়া দীর্ঘদিন থেকে পীরগাছায় চাকরি করার কারণে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সেই সিন্ডিকেটের সহযোগীয় বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগেও এই সিন্ডিকেট সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রেজাউল করিম পীরগাছায় যোগদানের পর দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তিনি দালাল ছাড়া কোনো কাজই করেন না। অফিস সময়ে দরজা আটকে ভেতরে বসে থাকেন তিনি। নিয়মিত অফিসে আসেন না। জরুরি কাজে কেউ দেখা করতে চাইলেও মেলে না অনুমোদন। এমনকি সেবাপ্রার্থীরা দালাল ছাড়া সরাসরি অফিসে গেলে হেনস্তার শিকার হন এই কর্মকর্তার মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেন না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদেরও ফোন রিসিভ করেন না তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনে পীরগাছা উপজেলায় ৯০টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। ৯০টি কেন্দ্রের জন্য ৯০ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৫৩৩ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ১০৬৬ জন পোলিং অফিসার নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে।
ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী শিক্ষকদের বাদ দিয়ে যারা দায়িত্ব পালন করতে চান না, তাদের নিয়োগ দিয়ে পরবর্তীতে নাম কাটা ও সংযোজন করতে দালালের মাধ্যমে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার ঘুষ বাণিজ্য করার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকেরা।
এ বিষয়ে একাডেমিক সুপারভাইজার ফারুকুজ্জামান ডাকুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পীরগাছা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, আমি শুধু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদেশ পালন করে যাচ্ছি। প্রশিক্ষণরত ও অসুস্থ শিক্ষক নিয়োগে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দায়ী। তাদের কারণে এমনটা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক বলেন, যদি ভুল-ত্রুটি থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশোধন করা হবে।