উজান থেকে ধেয়ে আসছে পাহাড়ি ঢল। এতে উত্তরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতেও পানি উঠেছে। এদিকে বন্যার্ত মানুষের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র ও শুকনো খাবার—জানিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবার ফুঁসে উঠেছে তিস্তা নদী। এতে তলিয়ে যাচ্ছে তিস্তার চরাঞ্চলের ফসলি জমি। পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় গবাদিপশু ও শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে শত শত পরিবার।
গত রোববার সন্ধ্যায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় পানির প্রবাহ সামান্য কমে গিয়ে এখনো বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান। তিনি আরো বলেন, তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তবে যেকোনো সময় পানি আরো বাড়তে পারে । এর মধ্যে ভুটান ও সিকিম পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির চাপে তিস্তা নদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দো-মহনী ও মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশে ধেয়ে আসায়, উভয় দেশের তিস্তায় লাল সতর্কতা জারির খবর পাওয়া গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সতর্কতার মধ্যে রয়েছি এবং তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইসগেট খুলে রাখা হয়েছে। নদীর আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, উজালের ঢল আর ভারি বর্ষণের কারণে কুড়িগ্রামে দুধকুমার, ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আকস্মিক বন্যার কারণে পরিবার-পরিজন ও গৃহপালিত প্রাণী নিয়ে বিপাকে পড়েছে প্লাবিত এলাকার মানুষ। অনেক এলাকায় নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন।
দুধকুমার নদের পানি ভুরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানিও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এতে বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে পাট, ভুট্টা, চীনাবাদাম, মরিচ, পটোলসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের ক্ষেত। বন্যার প্রভাবে জনজীবনে দুর্ভোগের পাশাপাশি ফসলহানিরও শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।
গতকাল সোমবার দুপুরের তথ্য অনুযায়ী, দুধকুমার নদের ভুরুঙ্গামারী পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে ধরলার পানি কুড়িগ্রাম সদর সেতু পয়েন্টের বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার মাত্র দুই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সব নদ-নদীতেই পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘উজানে ভারি বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার নদ-নদীর পানি বাড়ছে। দুধকুমার নদ ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
তিস্তা ও ধরলার পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পানি আরো বাড়তে পারে। তাই নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীরতে গত কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দুধকুমার নদের পানি বেড়েই চলেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বর্তমানে দুধকুমার নদের পানি ২৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্য দেখা দিতে পারে। অপরদিকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুকনো খাবার ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার অমৃত দেবনাথ বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। নদীতীরবর্তী জনসাধারণকে সতর্ক করতে মাইকিং করা হয়েছে। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টায় জেলার নদ-নদীর পানি আরো বাড়তে পারে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, ভারতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফের বাড়ছে তিস্তার পানি। উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেটের সবগুলোই খুলে দেওয়া হয়েছে। গত রোববার বেলা ৩টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ০৩ সেন্টিমিটার, যা বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে দুপুর ১২টায় ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।
জানা গেছে, ভারতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গামারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তা নদীতীরবর্তী চরে বাদামক্ষেত, ধানের বীজতলা, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানির লেভেল পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে তিস্তা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। বেলা ৩টায় বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, সকাল থেকে পানি বাড়ছে। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।