পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে এক শিক্ষকের রহস্যজনক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ করার পর ২১ ঘণ্টা থানায় পড়ে আছে লাশ। ময়নাতদন্ত করা নিয়ে টালবাহানা করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার সকাল ৮টায় উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের ভাউলাগঞ্জ বিজয়নগর এলাকায় আব্দুর রহমান (৭৫) নামে এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেন বলে পারিবারিক সূত্র জানায়। আব্দুর রহমানের প্রথম স্ত্রী রহিমা খাতুন স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকায় একই দিন চারজনকে আসামি করে দেবীগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুক্রবার রাতেই আব্দুর রহমানের লাশ থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
রহিমা খাতুনের অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্র জানা যায়, আব্দুর রহমান রহিমা খাতুনকে বিয়ের ১৫ বছর পর নাসিমা বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয় প্রথম স্ত্রীর সাথে। পরে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের ভাউলাগঞ্জ বিজয়নগর এলাকায় বাড়ি তৈরি করেন। এরপর থেকে দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথেই স্থায়ীভাবে থাকতেন আব্দুর রহমান। সম্প্রতি আব্দুর রহমানের মালিকানাধীন জমি রেজিস্ট্রি করে নিতে দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানরা নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন।
স্থানীয় সূত্র জানা যায়, বেশ কয়েক দিন থেকে আব্দুর রহমানের বাড়ি থেকে ঝগড়ার আওয়াজ আসছিল। তবে পারিবারিক বিষয় হওয়ায় কেউ প্রশ্ন করেনি এইসব বিষয়ে। শুক্রবার সকালে আব্দুর রহমানের মৃত্যুর বিষয়টি দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে আবু নাসিম মোবাইলে প্রথম স্ত্রীর ছেলে বেলাল হোসাইনকে জানান। খবর পেয়ে রহিমা খাতুন ছেলে বেলাল ও আরো দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে বিজয়নগরের বাড়িতে আসেন। বাড়িতে আসার পর তাদের কাছে আব্দুর রহমানের মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক মনে হয়নি।
তাদের দাবি, আব্দুর রহমানের বাম হাতে, কপালে এবং মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। শুধু তাই নয়, গোসল শেষে কাফনের কাপড় পরানো হলেও রক্ত ঝরছিল। আব্দুর রহমানের লাশ এই অবস্থায় দেখার পর তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রথম পরিবারের সদস্যরা।
এরপর তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের দাবি জানান। এরপর থেকে শুরু হয় নানা নাটকীয়তা। মেয়ে জামাই মোমিনুর ময়নাতদন্ত থামাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রথমদিকে পুলিশ ময়নাতদন্তে সায় না দিলেও প্রথম স্ত্রীর দাবির মুখে পরে লাশ দেবীগঞ্জ থানায় নিয়ে আসা হয়।
প্রথম স্ত্রীর ছেলে সাজেদুর রহমান বলেন, 'আমার বাবার শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে। আমরা থানায় অভিযোগ করেছি। গতকাল থেকে লাশ থানায় পড়ে আছে অথচ এখনো ময়নাতদন্ত হচ্ছে না। আজকে এসআই নাসিম নামে এক পুলিশ অফিসার আমাদেরকে বললো ডিসি স্যার নাকি যেতে বলেছেন। আমরা চারজন পঞ্চগড় গেছি। এডিসির রুমে নিয়ে গেছে কিন্তু আমার কোনো জবানবন্দি নেয়া হয়নি। সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর চায়, আমি স্বাক্ষর দেইনি।'
তবে দ্বিতীয় স্ত্রী নাসিমা বেগম ও তার সন্তানরা দাবি করেন, আব্দুর রহমান রাতে বাথরুমে গিয়ে পড়ে গেলে হাত ও মাথায় আঘাত পান। পরে তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে রেফার্ড করা হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে রমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে মারা যান আব্দুর রহমান।
এদিকে শুক্রবার রাত পৌনে ৮টায় দেবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সোয়েল রানা সাংবাদিকদের লাশ নিয়ে আসার বিষয়ে এবং ময়নাতদন্ত হবে বলে জানান। কিন্তু শনিবার বিকাল ৪টা পেরিয়ে গেলেও লাশ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়নি।
বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও কেন আইনগত ব্যবস্থা এখনো নেওয়া যাচ্ছে না এমন প্রশ্নে দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোয়েল রানা বলেন, 'আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। আমরা পরে এই বিষয়ে আপনাদের ডিটেইলস জানাবো।'
এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, 'আমি ওসির সাথে কথা বলে দেখছি। দ্রুত আইনগত প্রক্রিয়া শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
এমএস