স্পিডবোটের দাবিতে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি
গভীর রাতে প্রসবব্যথায় ছটফট করছেন এক অন্তঃসত্ত্বা নারী। চারদিকে শুধু নদী আর বালুচর। নেই অ্যাম্বুলেন্স, নেই পাকা রাস্তা, নেই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা। শেষ ভরসা চারজন মানুষের কাঁধ। বাঁশের সঙ্গে বেঁধে চেয়ারে বসিয়ে নদীর ঘাটের দিকে ছুটছেন স্বজনেরা। তারপর নৌকা, আবার দীর্ঘ পথ।
কিন্তু অনেক সময় সেই লড়াই জেতা হয় না। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় একটি প্রাণ কিংবা মায়ের বুক খালি করে পৃথিবী ছাড়ে অনাগত সন্তান। এটাই রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তিস্তা চর। এখানে হাজার হাজার মানুষের বসবাস হলেও জরুরি চিকিৎসাসেবা আজও রয়ে গেছে অধরা। গুরুতর অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, রোগীকে নদীর ঘাট পর্যন্ত নেওয়ার মতো সড়কও নেই। ফলে চেয়ার, জলচৌকি কিংবা খাটলিই হয়ে ওঠে চরবাসীর ‘অ্যাম্বুলেন্স’।
সম্প্রতি তিস্তা চরাঞ্চলে এক অসুস্থ বৃদ্ধকে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে বাঁশ ও দড়ি দিয়ে কাঁধে বহন করে নদীর ঘাটে নেওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি দেখে অনেকেই আবেগাপ্লুত হলেও চরবাসীর কাছে এটি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয় এটাই তাদের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রাম। গত ২৬ জুন দ্রুতগতির নৌযানের অভাবে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর আবারও সামনে আসে চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার করুণ চিত্র।
এই প্রেক্ষাপটে নোহালী ইউনিয়নের ২, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কচুয়া সরদারপাড়াসহ তিস্তা নদীর মাঝখানে অবস্থিত বিভিন্ন চর এলাকার প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি স্পিডবোট ও বেতনভুক্ত চালক নিয়োগের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) এলাকাবাসীর পক্ষে মো. আল আমিন স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, চারদিকে নদী থাকায় উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌযান। কিন্তু সরকারি স্পিডবোট বা জরুরি রোগী পরিবহনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সংকটময় মুহূর্তে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নোহালী ইউনিয়নের বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। অসুখ হইলে আগে চিন্তা করি মানুষটারে বাঁচামু কীভাবে। রাস্তা নাই, গাড়ি নাই। কাঁধে কইরা নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।’
একই এলাকার আব্দুস সালাম বলেন, ‘বালুচর পেরিয়ে, নদী পার হয়ে হাসপাতালে নিতে নিতে অনেক রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কেউ কেউ আর ফিরেও আসে না।’
কোলকোন্দ ইউনিয়নের এক নারী বলেন, ‘গর্ভবতী মায়েদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। প্রসবব্যথা উঠলে নৌকা পাওয়া যায় না। তখন কাঁধে করেই নদীর ঘাটে নিতে হয়। অনেক সময় মা আর সন্তান দুজনকেই হারাতে হয়।’ এলাকাবাসীর প্রতিনিধি মো. আল আমিন বলেন, ‘একটি স্পিডবোট অনেক সময় একটি প্রাণ বাঁচাতে পারে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি স্পিডবোট চালুর দাবি জানিয়েছি।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলেমুল বাসার বলেন, ‘তিস্তা চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জরুরি রোগী দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় অনেক সময় জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর করার জন্য কাজ করছি। তবে চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ ও দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্পিডবোট বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘স্মারকলিপি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, শুধু নোহালী ইউনিয়ন নয়, গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত সাতটি চরাঞ্চলীয় ইউনিয়নের মানুষের জন্যও সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত স্পিডবোট বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, প্রতিটি চরাঞ্চলেই জরুরি রোগী পরিবহনের একই ধরনের সংকট রয়েছে। তাই একটি ইউনিয়নকেন্দ্রিক নয়, বরং পুরো তিস্তা চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
এমএইচ