কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমার নদ ও কালজানী নদীর চরাঞ্চল হলুদ রঙের ফুলে ছেয়ে গেছে। মনে হয় দিগন্তবিস্তৃত হলুদ গালিচা বিছানো। এই চিত্র সরিষা ফুলের। এখানকার কৃষকরা এবার সরিষা চাষে বেশ লাভবান হওয়ার আশা করছেন। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। কৃষকরা বারী ১৪, ১৭, ১৮ ও বীনা ৮, ৯, ১১ জাতের সরিষা চাষ করেছেন।
গত বছর সরিষা চাষ হয়েছিল ৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে। গতবারের চেয়ে এবার ৬৫০ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা চাষ হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে চাষ হয়েছিল ১ হাজার ৬৫৪ হেক্টর জমিতে। প্রতি বছর সরিষা চাষ বাড়ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগে প্রণোদনার আওতায় সরিষা চাষে আগ্রহী করে তুলতে ১ কেজি করে ২ হাজার ৯০০ জন কৃষককে উন্নত জাতের সরিষার বীজ ও সার প্রদান করা হয়। এছাড়া তেল উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের একজন কৃষক ৩ একর জমিতে সরিষা চাষ করেছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানকার মাটি সরিষা চাষের উপযোগী। সেচ, সার ও অন্যান্য খরচ কম হওয়ায় সরিষা চাষে লাভ হয় বেশি।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, এখানকার বেশির ভাগ জমিতে কৃষকরা দুই ফসল উৎপাদন করেন। এখন ওই জমিতে সরিষা চাষ করলে তিন ফসল উৎপাদন সম্ভব। এতে একদিকে কৃষকরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে তেলের চাহিদাও মিটবে।
চলতি মৌসুমে সরিষা চাষ করতে উপজেলা কৃষি বিভাগ সঠিক সময়ে কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ ও সার দিয়ে উৎসাহিত করেছে। আমন কাটার পর ৩-৪ মাস পর্যন্ত জমি পতিত থাকে। এই সময়ে সরিষার চাষ করেন তারা। সরিষা কেটে একই জমিতে আবার বোরো আবাদ করা যায়।
অল্প সময়ে একই জমিতে দুটি ফসলের চাষে লাভবান হন কৃষক। সরিষা পরিপক্ব হতে সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস। বিঘাপ্রতি জমিতে খরচ হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে সরিষা হয় ৫-৬ মণ। দামও ভালো পাওয়া যায়।
চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। গতবারের চেয়ে ৬৫০ হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। আবাদে কম খরচ বলে সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা। এই মৌসুমে সরিষার বাম্পার ফলন আশা করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
সরেজমিন দুধকুমার ও কালজানী নদের জেগে ওঠা চরে দেখা যায়, সরিষার ফুলে সেজে আছে মাঠ। মধু আহরণে এখানে ব্যস্ততা বেড়েছে পতঙ্গকুলের। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত চারদিক। সরিষার ফুলে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।
সরিষা চাষে এবার বেশ লাভের স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। চাষে সময় লাগে কম, খরচ কম, লাভ বেশি। এ জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এখানকার কৃষকরা। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। এতে কৃষকরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশে সরিষার তেলের ঘাটতি কিছুটা মেটানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
উপজেলার চরভূরঙ্গামারী ইউনিয়নের আসাদ, আফজাল ও শফিয়ার বলেন, আমরা দুই বিঘা করে জমিতে সরিষা চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি দুই হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সরিষার ক্ষেতে গেলে প্রাণটা ভরে যায়।
উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের ছিটপাইকেরছড়া গ্রামের কৃষক দুলাল, লিটন ও মোস্তাফিজুর বলেন, আমরা আড়াই বিঘা করে সরিষা চাষ করেছি। আশা করছি ভালো ফলন হবে। এই সরিষা বিক্রি করে বোরো আবাদের খরচ জোগাড় হয়ে যাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল জব্বার বলেন, ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা একটা লক্ষ্যমাত্রা
স্থির করেছি। কয়েক বছরের মধ্যে সরিষার তেলের উৎপাদন ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। এই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কৃষকদের সরিষা চাষে উৎসাহিত করছি।