পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে তিস্তা নদী থেকে জালিয়াপাড়া বাঁধ পর্যন্ত ২ দশমিক ২২৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাক্কলন অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ডাব্লিউবিএম স্তরে পিকেট ইটের পরিবর্তে ২ নম্বর ইটের খোয়া ব্যবহার, সাব-বেসে অতিরিক্ত বালু মেশানো এবং নির্ধারিত আকারের পরিবর্তে বড় আকারের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার ৮৬৯ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ ট্রেডার্স সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।
মঙ্গলবার (৯ জুলাই) সরেজমিনে রাঙ্গাপানি সেতু সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে শ্রমিকরা ইট ভেঙে খোয়া প্রস্তুত করছেন। ভেঙে রাখা খোয়া ও গোটা ইট দেখে ইটের নিম্নমান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী ডাব্লিউবিএম স্তরে পিকেট ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে ২ নম্বর ইট ভেঙে খোয়া তৈরির অভিযোগ পাওয়া যায়।
পার্শ্ববর্তী মরাতল্লী বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, পিকেট ইটের রঙ আর আকৃতি দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এখানে খোয়া তৈরিতে যে ইট আনা হয়েছে, সেগুলোর রঙ ফ্যাকাশে আর অল্পতেই ভেঙে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ডাব্লিউবিএম স্তরে ২ নম্বর ইটের খোয়া ব্যবহার করায় তা তুলনামূলক নরম হওয়ায় কমপ্যাকশনের সময়ই গুঁড়ো হয়ে যেতে পারে। এতে রাস্তার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভারী যানবাহনের চাপ সহ্য করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে সাব-বেস নির্মাণের সময়ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী জহির ও মোশারফ নামে দুই ব্যক্তি বলেন, অনেক স্থানে খোয়ার তুলনায় বালুর পরিমাণ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া প্রাক্কলনে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি আকারের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন স্থানে ৬ থেকে ৭ ইঞ্চি আকারের খোয়া ব্যবহার করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
সড়কটির সাব-বেস লেয়ারের কয়েকটি স্থানে ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি গভীর করে বালু সরিয়ে খোয়ার দেখা মিলেছে। এতে প্রাক্কলন অনুযায়ী খোয়ার পরিবর্তে অতিরিক্ত বালুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল বারী বলেন, এভাবে নির্ধারিত আকারের খোয়ার পরিবর্তে বড় আকারের খোয়া ব্যবহার করলে সেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় ইন্টারলকিং তৈরি হয় না। ফলে কমপ্যাকশন দুর্বল হয়ে ভেতরে ফাঁকা জায়গা থেকে যায়। পরবর্তীতে ভারী যানবাহনের চাপে এসব স্থানে রাস্তা দেবে যাওয়া, পিচ উঠে যাওয়া এবং বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সাব-বেসে নির্ধারিত অনুপাতের চেয়ে বেশি বালু ব্যবহার করলে রাস্তার লোড বহনক্ষমতা কমে যায়। বৃষ্টির পানি প্রবেশ করলে ওই স্তর নরম হয়ে ‘স্পঞ্জিং’ সৃষ্টি করতে পারে। এতে ওপরের কার্পেটিংয়ে ফাটল দেখা দেওয়া এবং অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সাইদরের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মালিক হান্নান শেখ এলাকায় না থাকায় কাজ আটকে থাকার কথা জানান তিনি।
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী শাহরিয়ার ইসলাম শাকিল বলেন, আমি সাইটে গিয়েছিলাম। রং দেখে যাচাইয়ের উপায় নেই। ইটের স্ট্রেংথ যাচাইয়ের জন্য নমুনা ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। আমরা রিপোর্ট পাওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নেব। আর সাব-বেসের যে অংশে খোয়ার পরিমাণ কম, সেগুলো দেখিয়ে দিলে যাচাই করে অতিরিক্ত খোয়া ফেলানো হবে।
এমএইচ