বছরের শুরুতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে উঠেছিল স্বর্ণ। প্রতি ট্রয় আউন্সের দাম একপর্যায়ে ৫ হাজার ৬০২ ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর বিশ্ববাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক সপ্তাহে স্বর্ণের দাম কমেছে।
এখন তাই প্রশ্ন উঠেছে, স্বর্ণের দাম কি আরো কমবে?
আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাবে, বুধবার বিকেলে স্পট মার্কেটে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩৪৫ ডলারের আশপাশে লেনদেন হচ্ছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় বিশ্ববাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় দুই লাখ টাকার কাছাকাছি।
২০২৬ সালের শুরুতে স্বর্ণের দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছিল। গত ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৬০২ ডলারে পৌঁছায়। এরপর তা কমে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারের আশপাশে নেমে আসে।
বাংলাদেশেও চলতি বছর স্বর্ণের দাম বারবার ওঠানামা করেছে। গত ২৪ জুলাই ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি দুই লাখ ২০ হাজার টাকার ঘরে নেমেছিল। বুধবার কিছুটা বেড়ে তা দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বর্ণের বাজার বরাবরই অস্থির। বৈশ্বিক অর্থনীতি, যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, ডলারের দর ও সুদের হারের মতো নানা বিষয়ের ওপর এর দাম নির্ভর করে। ফলে স্বর্ণের দাম ঠিক কতটা কমবে বা বাড়বে, তা আগাম বলা কঠিন।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান হাবীব বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম আরো অস্থির হতে পারে। ডলারের দর বাড়া বা কমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ায় বা কমায় কি না, তার প্রভাব স্বর্ণের বাজারে পড়বে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণ মজুদের যে প্রবণতা শুরু করেছে, সেটিও বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন।
তিনি বলেন, রাশিয়া রিজার্ভের স্বর্ণ বিক্রি করছে। আবার চীন প্রতি মাসে স্বর্ণ কিনে তার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। এর সঙ্গে রয়েছে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোও স্বর্ণ কিনছে। ফলে প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে দাম কমছে কেন
কয়েক মাস ধরেই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে পতন দেখা যাচ্ছে। তবে বছরের শুরুতে যে হারে দাম বেড়েছিল, তার তুলনায় পতনের হার কম।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে।
এর পাশাপাশি আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির মূল সূচক চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ফলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দীর্ঘ সময় সুদের হার চড়া রাখতে হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়। কারণ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে সুদের হার বাড়লে সুদনির্ভর সম্পদে বিনিয়োগের আয় বাড়ে। ফলে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগ ব্যয় বাড়ে। এতে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বদলে অন্য সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের বাজার বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক ওয়ালবাউম বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ফেডের কঠোর নীতি স্বর্ণের দাম আরো নিচে নামাতে পারে। অন্যদিকে ফেড নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিলে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমবে। এতে স্বর্ণের দাম আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা তেলের দাম ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
দুই-এক দিনের মধ্যে সুদের হার নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাবে ফেড। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্যের দিকে তাকিয়ে আছে স্বর্ণের বাজার।
এদিকে সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত করার পর সরবরাহ নিয়ে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টিও বিনিয়োগকারীরা হিসাবের মধ্যে রাখছেন। চাহিদা কমে যাওয়ায় স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছে।
স্বর্ণ সরাচ্ছে বিভিন্ন দেশ
এই অস্থিরতার মধ্যে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুদের কৌশলও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রাখা নিজেদের স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা উত্তর আমেরিকা থেকে কয়েক টন স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে।
ব্যাংকটির ভাষ্য, এই স্থানান্তরের ফলে তারা ‘গুরুতর সংকটের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত’ থাকবে।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত মোট প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন সরিয়ে নিয়েছে লন্ডন।
এ বছরের শুরুতে ফ্রান্সও জানিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, দেশগুলো কেন স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে? তারা কি সামনে বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে?
বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করেন না যে আসন্ন কোনো বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমান অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত বিশ্বের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশগুলো এমন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাত দেশগুলোকে নিজেদের স্বর্ণের মজুদ দেশের কাছাকাছি রাখার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বলেন, যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনা এসব সিদ্ধান্তে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায় এমন স্থানে স্বর্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কাভাতোনির মতে, আসন্ন কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে—এমনটা তিনি মনে করেন না। বরং মানুষ এখন নিজেদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে আরো সচেতন হচ্ছে।
দাম কি আবার বাড়বে
মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশে এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল এক লাখ টাকার ঘরে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখ টাকার ঘর ছাড়ায়।
এরপর একের পর এক রেকর্ড হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম তিন লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
গত কয়েক মাসে দাম ওঠানামা করলেও নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল বেশি। ফলে এখন প্রশ্ন—দাম কি আরো কমবে, নাকি আবারও রেকর্ড ভাঙবে?
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বর্তমান পর্যায় থেকে স্বর্ণের দাম খুব বেশি কমার সম্ভাবনা নেই। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর প্রবণতা ভবিষ্যতে দাম বাড়াতে পারে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে গড়ে ১ হাজার টন স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। এর আগের দশকে এই গড় ছিল ৫০০ টন। বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির কারণে আগামী বছর এই পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান দামের তুলনায় যা প্রায় ৩০০ ডলার বেশি।
অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে ফেডের সুদের হার, তেলের দাম ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ স্বর্ণের দামে চাপ তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর প্রবণতা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা স্বর্ণের চাহিদা ধরে রাখতে পারে।
ড. আহসান হাবীব বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্বর্ণকে একটি মুদ্রা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তাই বিভিন্ন দেশ ও ব্যক্তি রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ রাখে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মানুষ স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। স্বর্ণের দাম বাড়ার সময় সাধারণত আন্তর্জাতিক মুদ্রার দর, সুদের হার ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা দেখা যায়।
অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন ড. আহসান হাবীব। তার মতে, এর ফলে স্বর্ণের দাম শিগগিরই আবার বাড়তে পারে। এতে ব্যক্তি পর্যায়ে স্বর্ণে বিনিয়োগও কিছুটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এএম