রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ছয় ব্যাংকের মধ্যে গত বছরের শেষ তিন মাসে পাঁচটির খেলাপি ঋণ কমলেও উল্টো বেড়েছে জনতা ব্যাংকের। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে অগ্রণী, সোনালী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৭৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ছিল ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণ ছিল ৭০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ।
জনতা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ২০টি গ্রুপের কাছেই আটকে আছে ৫২ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে। গত বছর শেষে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জনতা ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। এর মূল সুবিধাভোগী ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ব্যবসায়ীর অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, আবার কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ জানতে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মজিবুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে পাঁচ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৩৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বা ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণ কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে। তবে আরো খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
গত বছরের শেষ তিন মাসে বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ কমেছে ৩১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ছিল দুই হাজার ১৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল এক হাজার ৯৬ কোটি টাকা বা ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বিডিবিএলের এমডি জসীম উদ্দিন বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার ফলে খেলাপি ঋণ কমেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ব্যাংকের ঋণ ও আমানত দুটোই বেড়েছে। রপ্তানি বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স আহরণ জোরদারের পাশাপাশি আবাসন ঋণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোর ব্যাংকিং কার্যক্রম শক্তিশালী করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির কোনো তারল্য সংকট নেই এবং কোনো গ্রাহক টাকা তুলতে এসে ফেরত যাননি।
সংকটে থাকা বেসিক ব্যাংকও গত বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ছিল ১২ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল আট হাজার ২৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল আট হাজার ৮১১ কোটি টাকা বা ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি যেসব ব্যবসা সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল, তাদের আলাদাভাবে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক ব্যবসা আবার সচল হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে রিকভারি, রেগুলারাইজেশন ও রিশিডিউলিং—এই তিন পদ্ধতিতে কাজ করা হয়েছে।
গত বছরের শেষ তিন মাসে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে চার হাজার ৮১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ২৩ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা বা ৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ।
রূপালী ব্যাংকের এমডি কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছর নগদ ঋণ আদায়ে ব্যাংকটি শীর্ষ অবস্থানে ছিল। বছরের শুরু থেকেই খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে চার হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার এক কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন খেলাপি ঋণের হার সোনালী ব্যাংকের।