দেড় মাস পর আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বুধবার একটি ব্যাংক থেকে ৭ কোটি ডলার কিনেছে। এর আগে সর্বশেষ গত ২ মার্চ দুটি ব্যাংক থেকে আড়াই কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, গতকাল ৭ কোটি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কেনা হয়। সর্বশেষ ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ডলার কেনা হয়েছে ৫৫৬ কোটি ডলার, অর্থাৎ ৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ডলারের দর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আগেই বকেয়া পরিশোধ করে দিতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে ডলারের দামও কিছুটা বেড়ে যায়। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনা থেকে বিরত ছিল। যদিও বাজারে পর্যপ্ত ডলার ছিল। এখন ব্যাংকগুলোর বকেয়া পরিশোধের চাপ নেই। তাই ডলারের দর কমা শুরু করেছে। তাই আবার ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে রেমিট্যান্স বাড়ার ফলে ব্যাংকগুলোর ডলার বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে গত ১৪ এপিল পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৭৮১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক অতিরিক্ত দামে ডলার কেনায় দর কিছুটা বেড়েছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক মৌখিকভাবে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি ডলার কেনার একটি রেট বেঁধে দিয়েছে। আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার বিক্রিতে সর্বোচ্চ দর ১২২ টাকা ৭০ পয়সা এবং এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো থেকে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯০ পয়সা দরে রেমিট্যান্স কেনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট রিজার্ভ রয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী তা ৩০ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। তাতে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। এতে দেশের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করেও দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে অর্থপাচার রোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এ সময় প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় দুটিই বেড়েছে। এতে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে ডলারের দাম কমে আসার কথা। কিন্তু গত জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। যদিও সম্প্রতি রপ্তানি আয়ে টানা পতন হয়েছে।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিদিন বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশের বেশি বাণিজ্য সম্পর্ক আছে, সে দেশগুলোর মুদ্রার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি দেশের বাজারে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি দামও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ জন্য প্রতিদিন সকালে ডলারের দাম (রেফারেন্স রেট) প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো কারণে দেশের ডলারের দাম ঘোষিত এ রেফারেন্সের চেয়ে কমে এলে ডলার কেনার জন্য নিলাম ডাকছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাজারে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি রয়েছে। ডলারের দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখছে। ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে জানান তিনি।