গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন। এটি বর্তমান সরকারের এবং এই অর্থমন্ত্রীর পেশ করা প্রথম বাজেট। দেশের অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে এই প্রস্তাবিত বাজেটের প্রশংসা করছেন, আবার অনেকে এর কঠোর সমালোচনা করে একে উচ্চাভিলাষী তথা বাস্তবতা-বিবর্জিত বাজেট বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বাজেটের ইতিবাচক দিক
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভোজ্যতেলের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির প্রস্তাব এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুল্ক ছাড় সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রধান মাপকাঠি করার ঘোষণা এবং তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকেও ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।
বাজেটের চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
বাজেটে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হবে ঋণের সুদ পরিশোধে, যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বরাদ্দের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিলাসী পণ্য, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য এবং তামাকজাত পণ্যের ওপর নতুন করে ভ্যাট ও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে করের চাপ বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া অতীতে বড় বাজেট প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নের হার ছিল তুলনামূলক কম। বড় অংকের এডিপি এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা বাজেট বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে বলেও মত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি চিন্তাশীল বাজেট হয়েছে।”
তিনি বলেন, বাজেটের নীতি-কাঠামোতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে এক বছরের সময়, পরবর্তী তিন বছর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং আরো এক বছর অর্থনীতি বিনির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য আনতে বিনিয়ন্ত্রণ ও উদারীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে নীতি-কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক কাঠামো নিশ্চিত করা এবং বিদেশি ঋণের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ প্রস্তাবিত বাজেটকে কাল্পনিক, উচ্চাভিলাষী এবং বিএনপির দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, বাজেটে প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে আয়করকে ধরা হয়েছে এবং করের চাপ বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনের বাস্তবসম্মত পথনকশা অনুপস্থিত। কর আদায়ে নিয়োজিতদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের বিষয়েও কোনো দিকনির্দেশনা নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন। পাশাপাশি বাজেটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত আলোচনা নেই বলে মন্তব্য করেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এক বিবৃতিতে বলেন, বাজেটে নতুন আশার কথা থাকলেও অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকার পুরোনো পথেই হাঁটছে। ধনীদের ওপর প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি না করে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ অব্যাহত রাখার অভিযোগ করেন তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আপাতত কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ না রাখায় সরকারকে সতর্ক সাধুবাদ জানানো যায়। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন খাতে অর্থবিলের মাধ্যমে এ ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং কর ফাঁকির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। তাই এ ধরনের অনৈতিক সুযোগ যাতে পুনরায় ফিরে না আসে, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিতের সুস্পষ্ট পথরেখা না থাকাকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন এবং চূড়ান্ত বাজেটে এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।