দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। টানা আট মাস ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত মার্চ শেষে এ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র চার দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। অপরদিকে গত এক দশকের মধ্যে জিডিপি অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় জিডিপির গতি মন্থর বা শ্লথ হয়ে আছে।
দেশে গত কয়েক বছর ধরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে আছে। গত অর্থবছরে তা আরো কমে যায়। অবশ্য গত অর্থবছর ছিল গণঅভ্যুত্থানের বছর। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে গণআন্দোলনের সময় ব্লকেড, কারফিউ—এসব কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় থমকে যায়। বিনিয়োগ করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না তখন। এর প্রভাব পড়েছে পুরো অর্থবছরে। বেসরকারি বিনিয়োগে খরার ধারাবাহিকতা আওয়ামী লীগ সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কম-বেশি ছিল। নতুন সরকারের প্রথম মাসেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর।
বেসরকারি বিনিয়োগ কমার ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো রয়েছে দীর্ঘদিনের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট। এছাড়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দীর্ঘমেয়াদে রাখার কারণে পলিসি রেট বেশি, যার প্রভাবে ঋণের সুদহার অনেক বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ইরান সংকট নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে। এ সংঘাতের প্রভাবে দেশের জ্বালানি সংকট আরো গভীর হয়েছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অবস্থায় কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও অন্যান্য উপাদানে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। এর ফলে বিনিয়োগে স্থবিরতা এসেছে। এটা দীর্ঘমেয়াদে থাকলে জিডিপিতে প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে চার দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর আগে ঋণ প্রবৃদ্ধি কখনো এত কমেনি। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও এ প্রবৃদ্ধি সাড়ে সাত শতাংশের ওপরে ছিল। এছাড়া সবশেষ গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। ওই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির হার কমছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া হতাশাজনক। তবে দেখতে হবে কেন ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাবে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমেছে। তবে বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বন্ধ কল-কারখানা চালু করার। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে স্থবিরতা থাকবে না।
এদিকে গত অর্থবছরে জিডিপির আকার চলতি মূল্যে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। আর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে এত কম বেসরকারি বিনিয়োগ হয়নি। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে ২২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছিল।
কয়েক বছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল। টানা চার বছর ধরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সাড়ে ২৪ শতাংশ ছিল, এখন তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে সার্বিক বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ থেকে সাড়ে ২৮ শতাংশে নেমেছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য পরিবেশ তৈরি করার কথা বলে আসছেন। যদিও বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের পাশাপাশি বিনিয়োগ সম্মেলেনের আয়োজন করা হয়। এসব সভা-সেমিনার ও সম্মেলন আয়োজনের পরও বিনিয়োগ পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এই প্রবণতার অর্থ হলো শ্রমবাজারে প্রতিবছর যুক্ত হওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজ পাচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, নির্বাচনের পর প্রত্যাশা ছিল বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। মূলত বিনিয়োগের জন্য এখনো সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এখনো জ্বালানি সংকট, হয়রানি, উচ্চ সুদহার, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা বিরাজমান। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত বিনিয়োগের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। যদি এর সমাধান না করা যায়, তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বা ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে না; এর ফলে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি হওয়ার প্রধান খাত বেসরকারি বিনিয়োগ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার আরো কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা কোভিডের প্রথম বছরের (২০১৯-২০ অর্থবছরের) কাছাকাছি। ওই অর্থবছরে তিন দশমিক ৪৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, যা গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম।
গত অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই হার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়েও কম। ওই অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় চার দশমিক ২২ শতাংশ। গত অর্থবছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে। অর্থাৎ, বিগত দুই সরকারের মেয়াদের মধ্যেই গত অর্থবছরটি কেটেছে। তবে অর্থবছরের বেশিরভাগই কেটেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে ছয় দশমিক আট শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সে অনুসারে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়নি।
চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় সাত দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল পাঁচ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনা অতিমারির সংকটময় সময়ে প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। যদিও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জিডিপির হিসাব নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।