হোম > বাণিজ্য > অর্থনীতি

এনবিআরের কাঁধে ছয় লাখ কোটি টাকা আদায়ের ভার

কাওসার আলম

আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আদায় করতে হবে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ২১ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির মধ্যে রয়েছে এনবিআর। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি।

অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু চলতি অর্থবছরই নয়, বিগত এক যুগেও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে আদায়কারী সংস্থাটি। এর মধ্যে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে আরো বড় লক্ষ্য কাঁধে চাপছে এনবিআরের।

এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর খাত থেকে দুই লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ দুই খাত থেকে আদায় হবে মোট রাজস্বের ৭৪ শতাংশ। বাকি দুই লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা আয় হবে আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ক কর থেকে।

তবে এনবিআরের রাজস্ব আয়ের এ লক্ষ্যমাত্রা মোটেও বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি আমার দেশকে বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রায় বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেটা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের কর পদ্ধতির বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও খুব বেশি নয়। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি চার শতাংশ হতে পারে। আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের দুর্বল প্রবৃদ্ধির মধ্যে রাজস্ব আদায়ে এত বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। এছাড়া আগামী বাজেটে প্রচুর কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের করের বিস্তৃতি ছোট। এর মধ্যে ব্যাপকহারে কর ছাড়ের কারণে রাজস্ব আদায় আরো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জিং হবে।

চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে শ্লথগতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজনৈতিক পরিবর্তনজনিত অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি হলো রাজস্ব অর্জিত না হওয়ার প্রধান কারণ। এছাড়া উচ্চ সুদের হার এবং আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের কারণে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের সংকট রয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে (এডিপি) ধীর গতি, বিনিয়োগ মন্দা, রপ্তানিতে ভাটা, তীব্র কর্মসংস্থান সংকটের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট হয়েছে নানা অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এজন্য ন্যায্য, প্রযুক্তিনির্ভর, সার্বজনীন ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজস্ব কাঠামো বির্নিমাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আহরণের এ হার ৬.৬ শতাংশ। রাজস্ব আহরণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় একেবারে তলানিতে রয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের উন্নয়নে রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে রাজস্বের জোগান বাড়াতে হবে।

এনবিআরের একজন সদস্য আমার দেশকে বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন একটি গতিশীল অর্থনীতির। কিন্তু নানা কারণে সেটি কিছুটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক কাঠামোয়ও পরিবর্তন ঘটে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও বড় ধরনের ধীর গতি তৈরি হয়েছে। রাজস্বের বড় অংশই আসে সরকারের ব্যয় থেকে।

এনবিআর সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও নীতি) আজিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সরকার বিভিন্ন জনকল্যানমূলক কাজ করছে। এ অবস্থায় সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব প্রয়োজন। রাজস্ব বাড়ানোর জন্য করের আওতা বৃদ্ধি, মনিটরিং, বকেয়া আদায়, ফাঁকি রোধ, কমপ্লায়েন্স ঘাটতির মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

এদিকে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি সুবিধার কারণেও সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয় বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান। আগামী বাজেটে কর অব্যাহতির ঢালাও সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে একটি যৌক্তিক কাঠামো তৈরি করার কথা বলছে রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি। এ জন্য বেশকিছু প্রস্তাবনাও তৈরি করেছে তারা। এর মধ্যে রয়েছে নতুন কর ছাড়ের আগে অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বা রপ্তানি না বাড়লে ছাড় বাতিল, বেইস ইরোশান অ্যান্ড প্রফিট শিফটিং (বিইপিএস) কাঠামো অনুযায়ী কর ছাড় পর্যালোচনা, স্থায়ী কর অব্যাহতির পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মসংস্থান বা রপ্তানিভিত্তিক ছাড়।

কর্মকর্তারা জানান, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সেবা এখন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। এতে হয়রানি ছাড়া সহজেই এসব সেবা গ্রহণ করতে পারছেন করদাতাসহ সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে আগের তুলনায় করভীতি দূর হয়েছে।

কিন্তু সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ডিজিটালাইজেশন না হওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এনবিআর। এটির বাস্তবায়ন হলে করফাঁকির পরিমাণ অনেক কমে যাবে বলে আশা করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

রাজস্ব আহরণে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ এনবিআর

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক যুগেও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এনবিআর। রাজস্ব আদায় করতে না পারার কারণে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমিয়ে আনা হলেও সেটিও আদায় করতে পারেনি সংস্থাটি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে তা সংশোধন করে চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয় তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি অর্থবছরে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৩১ হাজার ৪২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয়কর, মূসক ও শুল্ক মিলিয়ে আদায় হয়েছে তিন লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

ইউরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রেও পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা, কমল ১৭ শতাংশ

এবারও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে

সীমিত সম্পদের মধ্যে দেশের সবাইকে স্বস্তি দিতে এ বাজেট

বিশাল ঘাটতির মেগা বাজেট ঘোষণা আজ

বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে যেসব বিষয়

ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

১৭ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত

সিগারেটের অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে কঠোর বিধিমালা

পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত

মুনাফা হ্রাসসহ ১১ কারণে দেশে রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে: সংসদে অর্থমন্ত্রী