হোম > বাণিজ্য > বাজার বিশ্লেষণ

বাজারে সরবরাহ চেইনে বিশাল ঘাটতি, দুই দিন ধরে পণ্য দিচ্ছে না কোম্পানিগুলো

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব

সরদার আনিছ

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর জেরে চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ সব ধরনের পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে এক ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের ইমাম উদ্দিন বাবলু আমার দেশকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর কোম্পানিগুলো পণ্যের দাম না বাড়ালেও দুদিনে নতুন কোনো পণ্য সরবরাহ করছে না। কোনো কোনো কোম্পানি একেবারেই পণ্য ছাড়ছে না। তাদের লোকজনের আনাগোনাও নেই, এমনকি বাজারে তাদের চেহারাও দেখা যায়নি গত দুদিনে। এতে ঘাটতি তৈরির সুযোগে অনেকে বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছেন।

তিনি বলেন, আমাদের ধারণা কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর পর পণ্য সরবরাহ শুরু করবে। এজন্যই এখন তারা পণ্য সরবরাহ করছে না।

একই ধরনের অভিযোগ করেন কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের তানজিম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী তানজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ার ঘোষণা আসার পর দুদিন ধরে পণ্য দিচ্ছে না কোম্পানিগুলো।

তবে দেশের বাজারে ভোগ্যপণ্যের বড় সরবরাহকারী নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন আমার দেশকে বলেন, কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে পণ্য সরবরাহ না করার তথ্যটি সঠিক নয়; বরং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সারা দেশে পরিবহন সংকটে সরবরাহ চেইনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কোনো কোম্পানিই সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ায় না। তারা এখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন ও উৎপাদন খরচের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়েও ভাবছে কোম্পানিগুলো।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন আমার দেশকে বলেন, এটি এক ধরনের চৌর্যবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়। বাজারে সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই হঠাৎ বাজারে পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। এটি সম্পূর্ণ অনৈতিক। এ ব্যাপারে সরকার কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং না করলে সাধারণ জনগণ আরো বেশি সংকটে পড়বে।

এদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দেখা গেছে সবজি পরিবহনে। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও টাঙ্গাইল থেকে সবজি আনা আড়তদার খলিলুর রহমান জানান, একেকটি ট্রাকে পরিবহন খরচ কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। ময়মনসিংহ টু ঢাকার একটি ট্রাকের ভাড়া সাড়ে ১৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে। এই বাড়তি পরিবহন ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপরই পড়বে বলে জানান তিনি।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের খুচরা সবজি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে এক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের সবজির কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।

কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা শাহানাজ বেগম বলেন, সব আড়তেই দাম বেড়েছে। তবে আর কিছুদিন পর নতুন সবজি বাজারে এলে দাম কমতে পারে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু সবজি নয়; দূরবর্তী এলাকা থেকে ঢাকাসহ বড় শহরে চাল, মাছ, মাংস, ডিম, আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে ডিজেলনির্ভর যানবাহন ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবহন খরচ বাড়লে উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিপিডির গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ভোগান্তি সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু খাদ্যপণ্যে নয়, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপরও পড়বে। তিনি পরিবহন ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দেন।

এদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বেনাপোল স্থলবন্দরেও ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। ব্যবসায়ী ও পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানভেদে ট্রাক ভাড়া পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোয় হ্যান্ডলিং চার্জ গড়ে ৯.৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে বাড়তি খরচ হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএসএম আহম্মেদ খোকন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিটি বাসে শুধু জ্বালানি বাবদ প্রায় ৪,০০০ টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। তাই সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয়ের চাপের কথা বলছে সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলে সরকারের টিকা কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারত। তিনি জনগণের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো বা অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পণ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ও বাড়বে। আয় একই থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোয় এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে সরকার জ্বালানি খাত থেকে যে রাজস্ব বা ভর্তুকিসংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার আশা করছে, তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

স্বস্তি নেই নিত্যপণ্যের বাজারে, বেড়েছে আটা ডিম মাছের দাম

আরো কমলো স্বর্ণ ও রৌপ্যের দাম

সবজিতে স্বস্তি মিললেও মাছ-মুরগি-ডিমে অস্বস্তি

রমজানে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আগাম প্রস্তুতি

সুপার মার্কেটেও দুর্দিন দোকানিদের

ফের বাড়ল সোনার দাম, ভরিতে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা

সরবরাহ সংকট নাকি সিন্ডিকেট, বছরের সর্বোচ্চ চূড়ায় সবজির দাম

রাজধানীতে মুরগির দাম বাড়তি, চালের দামেও অস্বস্তি

কমেছে ডিম ও সবজির দাম, স্থিতিশীল চালের বাজার

স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কমল কত