রাজধানীতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকটি এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রণয়ন করা হয়েছে কঠোর বিধিমালাও। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন নেই। সচিবালয়, সংসদ ভবন, আগারগাঁও, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ নির্ধারিত নীরব এলাকাগুলোতেও অবিরাম হর্ন ও বিকট শব্দে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। এতে শিশু, বয়স্ক, পথচারী, বাসিন্দা ও ট্রাফিক পুলিশের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দদূষণ শুধু শ্রবণশক্তির ক্ষতি করে না; এটি ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। অথচ আইন ও শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীর মোট ৯টি এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সচিবালয় ও আশপাশের এলাকা, আগারগাঁও, জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশের তিন কিলোমিটার এলাকা এবং ডিএনসিসি ঘোষিত গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন। তবে এসব এলাকায় যানবাহনের অবিরাম হর্ন, বিশেষ করে উচ্চশব্দের নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এতে হাসপাতাল, সরকারি কার্যালয় ও আবাসিক এলাকার শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।
২০২৫ সালে প্রণীত ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’-এ নিষিদ্ধ হর্নের ব্যবহার এবং অবৈধ হর্নের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে নিষিদ্ধ হর্ন উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাতের দায়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
বিধিমালায় সার্জেন্ট বা তার ওপরের পদমর্যাদার ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে জরিমানা করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। তারপরও কার্যকর নজরদারির অভাবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট সাময়িকীর এক গবেষণায় ঢাকার ৬৭টি স্থানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগরীর প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের সড়ক-শব্দ নির্দেশিকার চেয়ে বেশি শব্দের মধ্যে বসবাস করছেন। প্রায় ৯ লাখ মানুষ ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের সংস্পর্শে রয়েছেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আবু হানিফের মতে, উচ্চমাত্রার শব্দ শিশুদের কানের সংবেদনশীল কোষের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এতে শ্রবণশক্তি হ্রাস, শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে বধিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও ঘুমের ব্যাঘাত, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বর্তমান যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) শামসুর রহমান ভূঁঞা আমার দেশকে বলেন, অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টিকারী যানবাহন শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি আরো জোরালোভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু মেশিন আনা হয়েছে; অচিরেই এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে শব্দদূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, চালকদের সচেতনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীরব এলাকা ঘোষণা করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। নিয়মিত শব্দের মাত্রা পরিমাপ, নিষিদ্ধ হর্নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করলেই রাজধানীবাসীকে শব্দদূষণের ভয়াবহতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।