এনসিপির বিবৃতি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সাজা ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে অপর্যাপ্ত বলে মনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মঙ্গলবার রাতে বিবৃতিতে এ কথা জানায় দলটি। একই সঙ্গে জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জাসদ সভাপতি ও পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী ইনুকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে। এনসিপি মনে করে, প্রমাণিত অপরাধের মাত্রা, ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের নিরিখে এই মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
ইনু কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধী নন উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদের শাসনামলে ১৪-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে এবং দীর্ঘদিন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি ক্ষমতাসীন দলের গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক বৈধতা জুগিয়েছেন এবং ভিন্নমত দমনে গণমাধ্যম-নিয়ন্ত্রণমূলক আইনি কাঠামো রচনায় সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দমনপীড়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বৈঠকগুলোতে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা অভিযোগপত্রেই উঠে এসেছে।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ট্রাইব্যুনালের রায়ে ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি যথা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যমের ছবি দেখে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি করে তাদের আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়া, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে খোদ শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও দুষ্কর্মে সহায়তা দেন।
ইনুর বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগেই পৃথকভাবে ১০ বছর করে সাজা ঘোষিত হলেও তিনটি সাজা একযোগে কার্যকর হওয়ায় বাস্তবে ইনুকে সর্বসাকুল্যে মাত্র ১০ বছরই কারাভোগ করতে হবে। নির্যাতন, গুরুতর জখম, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও ইনুর ক্ষেত্রে দেওয়া সাজা অস্বাভাবিক রকম লঘু বলে এনসিপি মনে করে।
এতে বলা হয়, ইনুর অপরাধের প্রকৃতি, ভুক্তভোগীর সংখ্যা ও তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবকে ট্রাইব্যুনাল যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে পারেননি। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো অতি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর বার্তা প্রদানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায় ব্যর্থ হয়েছে। এনসিপি মনে করে, রাষ্ট্রপক্ষকে অবিলম্বে ইনুর সাজার বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে অপরাধের মাত্রা ও প্রকৃতি অনুযায়ী যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এনসিপি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, জুলাই গণহত্যা ও বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনাসমূহের বিচার কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন দাখিলে দীর্ঘসূত্রতা, দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর রায় ঘোষণা না হওয়া এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তদন্তকাজ অসমাপ্ত থেকে যাওয়ার বিষয়টি বিচার প্রক্রিয়ার গতি ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এনসিপি মনে করে, ক্ষমতায় থাকা সরকারের অন্যতম মৌলিক ও অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্ব হলো জুলাই গণহত্যা ও গুমের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করা। এই দায়িত্ব পালনে দীর্ঘসূত্রতা বা গাফিলতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এবং তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এনসিপি জুলাই গণহত্যা ও গুম-সংক্রান্ত সকল মামলার তদন্ত ও বিচার সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্নের লক্ষ্যে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় ও তদন্ত সংস্থায় পর্যাপ্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।
এএস