সাইবার সুরক্ষা আইন নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এটি মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের মতো বর্তমান সরকারও জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করার পথে এগোচ্ছে। নতুন আইনের আওতায় গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরির জন্য সরকার সংশোধনী আনার পরিকল্পনা করছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে সেই প্রয়োজনকে সংবিধান-স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক করা যাবে না। আইনের অপব্যবহার রোধে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ নিশ্চিত করা জরুরি।
মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে এসব কথা বলেন তারা। ‘সাইবার সুরক্ষা, না কণ্ঠরোধ? কার স্বার্থে মতপ্রকাশের নতুন সীমা নির্ধারণ ও আইন সংশোধন’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সাতটি সংগঠন—ভয়েস ফর রিফর্ম, দৃক, নাগরিক কোয়ালিশন, এইচআরএসএস, জেআরএ, ডিএসএ ভিকটিম অ্যালায়েন্স ও বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্স।
সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ, তাই সরকারকে অবশ্যই নাগরিকদের দাবি শুনতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব ও ‘ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, তিনি কোনোভাবেই সাইবার বা মানহানির আইনের কারণে সাংবাদিকদের বা কোনো নাগরিকের জেল হওয়ার পক্ষে নন। তবে একটি নিয়মতান্ত্রিক দেওয়ানি বা সিভিল পেনাল্টি (আর্থিক জরিমানা) থাকা উচিত। এ সময় তিনি একটি শক্তিশালী আইনি সুরক্ষার কাঠামো তৈরির ওপর জোর দেন।
সাইবার সুরক্ষা আইনসহ বিভিন্ন বিতর্কিত আইন প্রণয়নের সমালোচনা করে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, সরকার নিজের অপকর্ম আড়াল করা ও ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এসব আইন তৈরি করছে। সংস্কারের নামে সরকারের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে যেসব আইনি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলো একে একে দুর্বল করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস সাধারণ নাগরিকদের গ্রেপ্তারের বেশ কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে বলেন, সাইবার আইনের অধীনে কীভাবে সাধারণ মানুষ হয়রানি ও গ্রেপ্তারের শিকার হচ্ছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। তার মতে, বিদ্যমান আইনে এ ধরনের গ্রেপ্তারের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং সরকার নতুন আইনের আওতায় গ্রেপ্তারের সুযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে সংশোধনী আনার পরিকল্পনা করছে।
প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, কোনো সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চাইলে শুধু আইন দিয়ে তাকে ঠেকানো যায় না। বর্তমান সরকার জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করার পথে দ্রুত এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় সংলাপে আরও বক্তব্য দেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ, অল্টারনেটিভের সংগঠক ডা. তাজনুভা জাবীন, সাংবাদিক রাজীব আহমেদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দিদার ভূঁইয়া, সারোয়ার তুষার, নাগরিক কোয়ালিশনের হাসিব উদ্দিন হোসেন এবং এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজ ইসলাম।