রাজধানীতে নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে চালু হয়েছে পিংক বাস সার্ভিস। এ বাসের চালক, সহকারী ও কন্ডাক্টর সবাই নারী। তবে নতুন এ সেবা সম্পর্কে এখনো অনেক নারী যাত্রী অবগত নয়। ফলে অফিস সময়ের বাইরে বাসগুলোতে যাত্রীসংখ্যা কম থাকছে। অনেক সময় আসন ফাঁকা রেখেই চলাচল করতে হচ্ছে বাসগুলোকে।
অফিসে যাতায়াতের সময় অর্থাৎ সকাল ও বিকালে পিংক বাসে যাত্রীদের চাপ তুলনামূলক বেশি। তবে দিনের অন্য সময়ে যাত্রী কম থাকছে। যাত্রীদের অভিযোগ, বাসের রুট, সময়সূচি ও স্টপেজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
উদ্বোধনের তৃতীয় দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় রাজধানীর মতিঝিলে কথা হয় পিংক বাসের চালক সুপ্রিয়া কুন্ডের সঙ্গে। তিনি জানান, ডেমরা বাস ডিপো থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় যাত্রী নিয়ে মতিঝিলে এসেছেন। বিকালে অফিস ছুটির পর মতিঝিল থেকে যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে যাত্রাবাড়ী বাস ডিপোতে ফিরবেন।
সুপ্রিয়া কুন্ড বলেন, অফিস সময়ের বাইরে অল্পসংখ্যক যাত্রী নিয়েই বাস চালাতে হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি সীমিত বাস, রুট সংকট এবং বাস চলাচলের সময় সম্পর্কে যাত্রীদের অজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তবে নতুন এ সেবা নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে যাত্রীসংখ্যা বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।
বিভিন্ন স্টপেজে পিংক বাসের অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন নারী যাত্রী জানান, বাসটি কখন আসবে এবং কখন ছাড়বে—এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।
মতিঝিলে পিংক বাসে কথা হয় স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাধারণ গণপরিবহনে অনেক সময় আসন পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়ে যেতে হয়। ভিড়ের মধ্যে নারীরা বিভিন্ন সময় খারাপ স্পর্শ ও হয়রানির শিকার হন। নারীদের জন্য চালু করা বাসে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে। এ সময় নারী চালক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের সমালোচনা করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল রুটে বাস চালাচ্ছেন জান্নাতুল ফেরদৌসী। বিআরটিসিতে ছোট বাহন চালনার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি নারী বাসের চালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এ সিদ্ধান্তে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বাধার মুখে পড়েননি বলে জানান তিনি।
মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল রুটে বাস চালানো খাদিজাতুল রিমা বলেন, একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে আলাদা আনন্দ রয়েছে। তিনি বলেন, বাসের সংখ্যা বাড়লে নারীরা এ সেবাকে আরো বেশি ব্যবহার করবেন।
চালকরা জানান, শুরুতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ তাদের সহযোগিতার জন্য পুরুষ সহকর্মীরা সঙ্গে থাকছেন। কোনো সমস্যায় পড়লে তারা সহযোগিতা করছেন। রাস্তায় পুলিশ এবং অন্যান্য বাসের চালক-হেলপাররাও সহযোগিতা করছেন বলে জানান তারা।
পস মেশিনে ভাড়া আদায়
পিংক বাসে পয়েন্ট অব সেল (পস) মেশিনের মাধ্যমে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঢাকার ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং ৯টি দ্বিতল। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী এসব বাসে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে বাস, ডিপো ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার তালিকা রাখা হয়েছে।
নারী কন্ডাক্টর তানিয়া আক্তার বলেন, তার রুট গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে বিমানবন্দর। নারী যাত্রী থাকায় কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন তিনি। সিসিটিভি, ই-টিকিটিংসহ আধুনিক সুবিধা থাকায় এ সেবার সফলতার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশিক্ষক থেকে বাসের চালক
গোলাপি বাস চালানোর আগে নারী চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিসির প্রশিক্ষক ও চালক হিসেবে কাজ করা নারীদেরই গোলাপি রঙের বাস দিয়ে রাজধানীর সড়কে নামানো হয়েছে। খাদিজাতুল রিমা জানান, তিন বছর ধরে বিআরটিসির প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। পরে প্রায় দেড় মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে বড় বাস চালানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষক হিসেবে নারীদের পাশাপাশি অন্যান্য বাসচালক, স্কুটি ও মোটরসাইকেল চালককেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লাকি বলেন, গণপরিবহনে নারীদের বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হতে হয়। নারী চালক ও কন্ডাক্টর পরিচালিত বাস হওয়ায় সেই ভয় অনেকটাই কমবে। সকালে অনেক সময় বাসে জায়গা থাকে না, আবার কিছু বাসে নারীদের নিতে অনীহাও দেখা যায়। এতে সময়মতো ক্লাস বা কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়। পিংক বাস চালু হওয়ায় এই সমস্যার সমাধান হবে। চাকরিজীবী মৌ ইসলাম ও সীমা আক্তারও নারী বাসে নিরাপদে চলাচলের আশা প্রকাশ করেন।
তিন মাসে ৫০ বাস চালুর লক্ষ্য
বিআরটিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি পিংক বাস চালুর লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সেবা চালু করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরের ১৩টি পথে মোট ১৪টি বাস চলবে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি এবং চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় দুটি করে বাস থাকবে। ঢাকা নগরের ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৬টি—মোট ১৩৪টি স্থান থেকে যাত্রীসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ সেবায় ই-টিকিট চালু করা হয়েছে। তিনটি বাসে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব বাসে এসব সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
উদ্যোগ আগে ব্যর্থ হয় চারবার
নারীদের জন্য পৃথক বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। বিআরটিসি সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম মহিলা বাস সার্ভিস চালু হয়। নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এ সেবা উদ্বোধন করা হয়।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মোট ১২টি বাস চালুর উদ্যোগ থাকলেও নিয়মিত পাঁচটির বেশি বাস চলাচল করত না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস না পাওয়ার অভিযোগ ছিল নারী যাত্রীদের। পরে কিছু বাস নারীদের লিজ দেওয়া হয়। তবে চালক ছিলেন পুরুষ। লোকসানের মুখে এক নারী উদ্যোক্তা লিজ প্রত্যাহার করে নেন।
২০০৯ সালে আবার এ সেবা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর ২০১৫ সালে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে রাজধানীতে ফের নারীদের জন্য বিশেষ বাস চালু করে বিআরটিসি। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়া, দুর্বল রুট পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই উদ্যোগও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
এবারও উদ্যোগটি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। বিআরটিসির এক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নারী যাত্রীদের পক্ষ থেকে পৃথক বাসের চাহিদা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তার মতে, পৃথক বাসের পাশাপাশি পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি।
বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে মহিলা বাস নামানো হয়েছে। আগেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে সফল হয়নি। এবার সফল হবে কি না—সময়ই তা বলে দেবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অতীতে এ উদ্যোগ সফল হয়নি। এবারও সফলতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত সমীক্ষা ও গবেষণা করা হয় না। নারীদের সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, ঢাকার কর্মজীবী নারীদের জন্য মেট্রোরেলের মতো নিরাপদ, দ্রুত ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে পৃথক মহিলা বাসের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।
যানজটেও আত্মবিশ্বাসী নারী চালক
রাজধানীর যানজটপূর্ণ সড়কে বড় বাস চালানো নিয়ে আত্মবিশ্বাসী জান্নাতুল ফেরদৌসী। তবে সড়কের অবস্থা আরো উন্নত হলে কাজটি সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি। জান্নাতুল বলেন, এই যানজটপূর্ণ শহরে রাস্তা আরেকটু ভালো করে দেওয়ার অনুরোধ আমার।