খসড়া আইনের সমালোচনায় টিআইবি
সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের যে খসড়া প্রণয়ন করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে গঠিত কমিশন কোনোভাবেই একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে না মর্মে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সোমবার সরকারের নিকট ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় আইনটিতে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সরকারের প্রভাবমুক্ত একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘকাল লালিত জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং প্যারিস নীতিমালা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে টিআইবিসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষ থেকে প্রাপ্ত মতামতকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে আইনটি চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে সংস্থাটি। বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো টিআইবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
টিআইবি জানিয়েছে, প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে, যা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না উল্লেখ করা হয়। টিআইবি উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছে যে, নতুন খসড়া আইনের ধারা ৩(২)-এ সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। যা নির্বাহী বিভাগকর্তৃক কমিশনকে করায়ত্ত করাসহ সংস্থাটিকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
তা ছাড়া, খসড়া আইনের ধারা-৭ এ কমিশনার নিয়োগ বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে স্পিকার, দুইজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। এর ফলে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের তথা নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং নিয়োগ-প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়াসহ স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা সংশোধন করতে হবে।
টিআইবি আরো জানিয়েছে, বিশেষ গুরুত্বসহ টিআইবি খসড়া আইনের ধারা-১৩ তে কমিশনের কার্যাবলী হিসেবে নিম্নোক্ত বিধানসমূহ অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে-
ক. সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা ও অনুরূপ নজরদারী সংস্থা, এবং সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটককৃত ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন স্থানসমূহের নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা;
খ. এইরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান; এবং
গ. এ সকল স্থান আইন-বহির্ভূত হলে, তা বন্ধ করা ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সরকারের নিকট সুপারিশ করা।
টিআইবি আরো জানায়, এ ছাড়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য হলে, তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে টিআইবির সুপারিশ হচ্ছে ধারা-১৬ তে অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর গোয়েন্দা বা অনুরূপ নজরদারি সংস্থার সদস্য হলে, তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে।
একইসঙ্গে, ধারা-২০ এ ২০০৯ সালের আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার হুবহু প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা-বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত করা এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে। মূলত এই দুর্বলতার কারণেই জিএএনএইচআরআই থেকে মানবাধিকার কমিশন কখনোই এ স্ট্যাটাস পায়নি। এক্ষেত্রে টিআইবি ধারা-২০ বাতিল করার আহবান জানায়।
টিআইবি বলছে, খসড়া আইনে কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে টিআইবির সুপারিশ হচ্ছে- ধারা ৫(৩)-এ কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে, কমপক্ষে দুইজন নারী কমিশনার রাখার সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশের পরিবর্তে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ করা এবং এই ধরনের পদে নিয়োগ-প্রক্রিয়াও সর্বদা সবার জন্য উন্মুক্ত, স্পষ্ট, স্বচ্ছ, যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে এরূপ বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করছে টিআইবি।
এমই