বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হবে। তিনি বলেন, ১৩–১৪ শতাংশ সুদের হারে অর্থায়ন নিয়ে টেক্সটাইলের মতো শিল্প টিকে থাকা সম্ভব নয়।
বুধবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি)-তে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল, নিটিং অ্যান্ড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এক্সপো (বিটিকেজি এক্সপো ২০২৬)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও ইনফোরচেইন ডিজিটাল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে প্রদর্শনীটি ২ মে পর্যন্ত চলবে। এতে টেক্সটাইল, নিটওয়্যার ও গার্মেন্টস খাতের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শিল্পখাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প—বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হার এ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
“এ ধরনের সুদের হার হয়ত উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর বা পুঁজিঘন শিল্পের জন্য সহনীয় হতে পারে, কিন্তু আমাদের মতো শ্রমনির্ভর ও স্বল্প মুনাফার শিল্পের জন্য নয়,” তিনি বলেন।
তিনি জানান, দেশে বর্তমানে গ্যাসের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। মোট চাহিদা প্রায় ৪,৩০০ এমএমসিএফডি (প্রতিদিন মিলিয়ন ঘনফুট), যেখানে দেশীয় উৎপাদন ১,৭০০ থেকে ২,৩০০ এমএমসিএফডির মধ্যে।
এর সঙ্গে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে আরও প্রায় ৯০০ এমএমসিএফডি সরবরাহ যোগ হচ্ছে। এতে দৈনিক প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৭০০ এমএমসিএফডির ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার এলএনজি আমদানি বাড়াতে আগ্রহী হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় বাধা। বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) রয়েছে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ এমএমসিএফডি এবং এগুলো প্রায় ৯০ শতাংশ দক্ষতায় পরিচালিত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনে শিগগিরই টেন্ডার আহ্বান করা হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দ্রুত ভিত্তিতে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে বেসরকারি খাত অগ্রণী ভূমিকা রাখবে এবং সরকার নীতিগত ও লজিস্টিক সহায়তা দেবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যবসা সহজীকরণে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সরল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে প্রায় ২৫–২৬টি লাইসেন্স নিতে হয়, যা পেতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চালুর কাজ করছি, যেখানে আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে প্রভিশনাল অনুমোদন দেওয়া হবে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারেন,” তিনি বলেন।
তিনি জানান, বন্ড ও কর-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াও সরল করার উদ্যোগ চলছে, যাতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয় এবং হয়রানি কমে।
রাজস্ব বিষয়ে তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে করের হার বাড়ানোর বদলে করের আওতা সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে করদাতা ও কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানো হবে, যাতে হয়রানি কমে।
অনুষ্ঠানে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সভাপতিত্ব করেন। এ সময় প্রদর্শনীর আহ্বায়ক ফজলে শামীম এহসান এবং ইনফোচেইনের নির্বাহী পরিচালক স্পেনসার লিন বক্তব্য দেন।
এবারের প্রদর্শনীতে বাংলাদেশসহ প্রায় ২৮টি দেশের ৯০০ প্রদর্শক অংশ নিচ্ছেন। প্রায় ২০ হাজার বর্গমিটার এলাকায় ১,২০০টি বুথে কানাডা, চীন, তাইওয়ান, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান তাদের সর্বাধুনিক পণ্য ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করছে।
প্রদর্শনীতে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতের উন্নত যন্ত্রপাতি, ডাই ও কেমিক্যালস, নিটিং ও বয়ন প্রযুক্তি, এমব্রয়ডারি, কাটিং ও সেলাই যন্ত্র, ওয়াশিং ও ড্রাই ক্লিনিং প্রযুক্তিসহ নানা উদ্ভাবনী সমাধান তুলে ধরা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ আয়োজন শিল্পের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি হালনাগাদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।