ভেটেরিনারি পেশার কাঠামোগত সংস্কার ও উন্নয়ন, পেশাগত স্বকীয়তা এবং অধিকার রক্ষায় তিন দফা দাবিতে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গাকৃবি) মানববন্ধন করেছেন ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্স (এফভিএমএএস) অনুষদের শিক্ষার্থীরা।
রোববার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদ, প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে এ কর্মসূচি পালন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে ভেটেরিনারি চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করে আসছেন। জনসংখ্যা ও প্রাণিসম্পদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে প্রাণিজ আমিষ এবং প্রাণিস্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও বেড়েছে। একই সময়ে দেশে ভেটেরিনারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ভেটেরিনারি গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সে অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে ভেটেরিনারি জনবল কাঠামো সম্প্রসারিত হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, পাকিস্তান আমলে ১৯৬০-এর দশকে থানা পর্যায়ে প্রাণিসেবা নিশ্চিত করতে ‘থানা সহকারী ভেটেরিনারি সার্জন’ পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৩-৮৪ সালে নবম গ্রেডে ক্যাডারভুক্তির মাধ্যমে পদটি ‘ভেটেরিনারি সার্জন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের দাবি, প্রায় ছয় দশক পরও উপজেলা পর্যায়ে একজন ভেটেরিনারি সার্জনের মাধ্যমে পুরো উপজেলার প্রাণিচিকিৎসা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনার বাস্তবতা বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, সম্প্রতি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে ‘সহকারী ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ অফিসার’ নামে ৪৯২টি নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৪৬টি এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে আরও ২৪৬টি পদ পর্যায়ক্রমে সৃষ্টির কথা রয়েছে।
তাদের মতে, নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভেটেরিনারি স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদার করা হলেও পদটির গ্রেড, নিয়োগের যোগ্যতা ও পেশাগত কাঠামো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। ভেটেরিনারি গ্র্যাজুয়েটদের দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞানভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ও একাডেমিক শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে কোনো পদ কাঠামো তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে পেশাটির দায়িত্ব বণ্টন ও কাঠামো নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
মানববন্ধন থেকে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন।
প্রথম দাবিতে, ‘সহকারী ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ অফিসার’ পদটি নবম গ্রেডে উন্নীত করে এ পদে শুধু নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানদের নিয়োগের দাবি জানানো হয়।
দ্বিতীয় দাবিতে, ক্যাডার কাঠামোর বাইরে নন-ভেটেরিনারিয়ানদের পদোন্নতির মাধ্যমে নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানদের সমকক্ষ বা উচ্চতর পদে পদায়নের সুযোগ ভবিষ্যতে না রাখার দাবি জানানো হয়।
তৃতীয় দাবিতে, প্রাণিসম্পদ খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি উপজেলায় চারটি করে ভেটেরিনারি সার্জনের পদ দ্রুত সৃজন এবং এসব পদে নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানদের নিয়োগ কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে ভেটেরিনারি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. নাসিম আহমেদ বলেন, প্রাণিসম্পদ খাত শুধু দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নয়; প্রাণীর রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত রোগ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য নিশ্চিত করার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাঠপর্যায়ে দক্ষ ও প্রয়োজনীয়সংখ্যক ভেটেরিনারি জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষদের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বলেন, প্রাণিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ভেটেরিনারি পেশার জনবল কাঠামোকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। তাদের দাবি বাস্তবায়ন হলে ভেটেরিনারি পেশার পেশাগত স্বকীয়তা ও মর্যাদা সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের প্রাণিস্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার সুযোগ তৈরি হবে।
শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।