জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যার ঘটনায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, তার ছেলে ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সাক্ষী সাবাব হোসেন মেহের।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি শেষে এ দাবি জানান তিনি। সাবাব জুলাই বিপ্লবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জয়-পলকের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে সাবাব হোসেন মেহের বলেন, তার বর্তমান বয়স ২৩ বছর। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জুলাই বিপ্লবের শুরু থেকেই রাজপথে ছিলেন তিনি। ১৮ জুলাই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তারা কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। এ সময় তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ, র্যাব ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও শটগান থেকে গুলি করে। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে আশ্রয় নিলে পুলিশ গেটের ভেতরের দিকে শটগানের গুলি ছোড়ে। এতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী হতাহত হন। ওই দিন ইম্পেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী জিল্লুর শেখ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। সাড়ে ১২টার দিকে তার লাশ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভেতরে নিয়ে আসেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ওই দিন বাসায় ফিরে রাতে দেখতে পান ইন্টারনেট কাজ করছে না। তখন ভেবেছিলেন হয়তো বাসার ওয়াইফাই কাজ করছে না। তাই মোবাইল ইন্টারনেট অন করে দেখেন সেটাও বন্ধ। বন্ধুবান্ধব এবং বড় ভাইদের ফোন দিয়ে জানতে পারেন তারাও ইন্টারনেট সংযোগ পাচ্ছেন না। তখন বুঝতে পারেন, সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করার কারণ ছিল, যাতে আন্দোলনকারীরা কোনো পরিকল্পনা করতে না পারেন এবং সিম ব্যবহার করতে বাধ্য হন; যার ফলে তাদের ট্র্যাক করা সহজ হবে। এরপর ব্লক রেইডের মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল, যাতে সারাদেশের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশে এবং বহির্বিশ্বের মানুষ জানতে না পারেন। ওই সময় বন্ধুদের ফোন করে জানতে পারেন, ওই দিন রামপুরা-বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন।
জবানবন্দিতে এই জুলাইযোদ্ধা বলেন, ১৯ জুলাই জুম্মার নামাজ পড়তে তিনি আফতাবনগর এ-ব্লক মসজিদে যান, যা ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কাছেই। তখন ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পাশে একটি গলির মুখে দাঁড়িয়ে দেখতে পান—পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা রামপুরা ব্রিজের ওপর থেকে সাধারণ জনগণ ও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করছে। তখন ৪-৫ জনকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখেন তিনি। পুলিশ যেদিকেই আন্দোলনকারীদের দেখছিল, সেদিকেই গুলি করতে থাকে। এ সময় গুলিবিদ্ধ অনেককেই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দিন রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় ৩৫ থেকে ৪০ জন আন্দোলনকারী ও সাধারণ জনগণ নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানতে পারেন তিনি।
তিনি বলেন, ১৮ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। এরপর থেকে সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট সংযোগ চালু করা হয়। তখন জানতে পারেন, সারাদেশে ব্লক রেইড হয়েছে এবং অসংখ্য আন্দোলনকারী আহত ও নিহত হয়েছেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কল রেকর্ড শুনতে পান। ওই কল রেকর্ডে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলক এবং উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের কথোপকথন ছিল। সেখানে জানা যায়, শেখ হাসিনার নির্দেশে তার ছেলে জয়ের তত্ত্বাবধানে পলক ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জয় তখন শেখ হাসিনার আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
সবশেষে এই হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য দায়ী ফ্যাসিস্ট হাসিনা, তার ছেলে জয়, পলক ও সালমান এফ রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি জানান তিনি।