জুলাই বিপ্লবে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডসহ আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে গুম, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ের করা আট মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এসব মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ হেভিওয়েট ৫৫ জন আসামি রয়েছে।
বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল-২-এ এসব মামলার বিচার চলছে।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণহত্যা এবং গুম, নির্যাতন ও খুনের অসংখ্য মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনায় হেভিওয়েট আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। এছাড়া জুলাই শহীদ পরিবার ও গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব আসামির বিচারের জোর দাবি রয়েছে।
মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণহত্যার ৫টি মামলা। এগুলো হলোÑ
১. জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে করা মামলা। এ মামলায় ইতোমধ্যে পাঁচজন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলার তারকা সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন তৎকালীন সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহমেদ। আসামিদের সরাসরি নির্দেশে গণহত্যার ঘটনা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে ইন্টারনেট বন্ধ করাসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
২. জুলাই গণহত্যার অন্যতম নির্দেশদাতা হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে ২৬ জন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলার অপর আসামিরা হলেন— যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, মাঈনুল হোসেন খান নিখিল, সন্ত্রাসের দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
৩. জুলাই গণহত্যার অন্যতম আসামি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও তার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলায় সাতজন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। সাক্ষীরা বলেছেন, সালমান এফ রহমান কারফিউ দিয়ে আন্দোলনকারীদের শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে আনিসুল হক আড়াই শতাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে জুলাই আন্দোলন দমন ও হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন।
৪. জুলাই বিপ্লবে রামপুরায় নির্বিচারে গুলি করে ২৮ জনকে হত্যাসহ অসংখ্যা ছাত্রজনতাকে গুরুতর আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে চার সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলার অন্যতম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন গঙ্গাচরণ রাজবংশীর ছেলে বিশ্বজিৎ রাজবংশী। তিনি বাবা হত্যার ঘটনা তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের সামনে। অপর আসামিরা হলেন— মেজর রাফাত বিন আলম, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান।
৫. জুলাই বিপ্লবে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ কর্মকর্তা ময়নাল হোসেনের ছেলে ইমাম হাসান তায়িম হত্যার ঘটনায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। এ মামলায় শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেনসহ সাতজন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন।
মোট ১১ জন আসামির মধ্যে ৯ জনই পলাতক। তারা হলেনÑঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক ও সাবেক উপপরিদর্শক সাজ্জাদ উজ জামান। কারাগারে আছেন দুই আসামি। তারা হলেনÑযাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।
এছাড়া আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে গুম-খুনের তিনটি মামলা ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে। এগুলো হচ্ছে—
১. আওয়ামী লীগের শাসনামলে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরু্দ্ধে তিনজন সাক্ষী জবানববন্দি দিয়েছেন। মামলায় অন্যতম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান। এ মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ সাতজন পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার রয়েছেন ১০ জন। তারা হলেন— ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কামরুল হাসান, মাহাবুব আলম এবং কেএম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও সারওয়ার বিন কাশেম।
২. আওয়ামী শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) বা আয়নাঘরে ২৬ জনকে গুম, নির্যাতনের মামলায় শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক-বর্তমান ১১ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বর্তমান সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমানসহ চার সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন।
৩. এছাড়া রয়েছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম. নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় করা মামলার আলোচিত আসামি বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। তার বিরুদ্ধে চার সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্যতম সাক্ষী বিডিআর হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলাম মল্লিকের স্ত্রী মুন্নী আক্তার জানান, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় তার স্বামী আত্মগোপনে ছিলেন। ছদ্মনাম নিয়ে চাকরি করছিলেন গোপালগঞ্জে। একদিন বাসা থেকে কর্মস্থলে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। পরে বরগুনার বলেশ্বর নদীতে তার লাশ পাওয়া যায়। গোয়েন্দা সংস্থার লোক মারফত জানতে পারেন, জিয়াউল আহসান তার স্বামীকে হত্যা করেছেন।