ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি
জুলাই বিপ্লবে রামপুরায় নির্বিচারে গুলি করে ২৮ জনকে হত্যাসহ অসংখ্যা ছাত্র-জনতাকে গুরতর আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় পঞ্চম সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন আন্দোলনের নিহত রাকিব হোসেনের সহকর্মী মারুফ হোসেন।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।
জবানবন্দিতে মারুফ হোসেন বলেন, আমি পাওয়ারগ্রিড অব বাংলাদেশ কোম্পানিতে সহকারী মার্কেটিং ম্যানেজার পদে চাকরি করি। আমাদের অফিসটি আফতাবনগর এ ব্লকে অবস্থিত। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই অফিসে থাকাবস্থায় দুপুর তিনটার দিকে অফিস ভবনের ১৩ তলা থেকে দেখতে পাই, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হচ্ছে। এরপর দিন ১৯ জুলাই শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সহকর্মী রাকিব আমার বাসায় আসে। ওই সময় ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। অফিসে ইন্টারনেট আছে কি না তা দেখার জন্য আমি এবং রাকিব আমাদের অফিসে যাই এবং দেখি সেখানেও ইন্টারনেট নেই।
জবানবন্দিতে মারুফ বলেন, অফিস থেকে ফেরার সময় দেখতে পাই আফতাবনগরের ভিতর থেকে আন্দোলনকারী ছাত্ররা রামপুরা মেইন রোডের দিকে যাচ্ছে। রাকিব আমাকে বললো চলো আমরাও যাই। আমি এবং রাকিব তাদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। আমরা আফতাবনগর গেইট পার হয়ে একটু সামনে এগিয়ে যাই। তখন হাতের বামে ওয়াসার গেইট থেকে দেখতে পাই বিজিবি এবং পুলিশ অস্ত্রসহ রামপুরা ব্রিজের দিকে আসছে। আমরা মেইন রোড পর্যন্ত যাই। তখন দেখি পুলিশ এবং বিজিবি রামপুরা ব্রিজ থেকে আন্দোলনরত ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি করছে। গুলির শব্দে আমি, রাকিব এবং অন্যান্য ছাত্রজনতা পিছু হটে আসি। আমি এবং রাকিব নিকটস্থ একটি যাত্রী ছাউনির নিচে আশ্রয় নিই। এরপর রাকিব মেইন রোডের দিকে গেয়ে যায় এবং একটি বট গাছের আড়াল থেকে মোবাইলে ভিডিও করার জন্য পকেট থেকে ফোন বের করে। আমি হঠাৎ দেখতে পাই রাকিব পিছনের দিকে পড়ে যায়। আমি দৌড়ে তার কাছে যাই এবং দেখতে পাই তার তলপেট থেকে রক্ত বের হচ্ছে। বিজিবি এবং পুলিশের গুলিতে রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়।
জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, রাকিবকে কোলে জড়িয়ে ধরে পিছনের দিকে যেতে থাকি। কিছুদূর যাওয়ার পর একটি রিকসা পাই। তাকে রিকসায় উঠালে সে রিকসা থেকে পড়ে যায়। পিছন থেকে বিজিবি এবং পুলিশ আমাদের কাছাকাছি চলে আসে এবং পুনারয় গুলি ছোড়ে। গুলির আওয়াজ শুনে রিকসাওয়ালা দৌড় দেয়। পরবর্তীতে কয়েকজন লোকের সহযোগিতায় রাকিবকে নিকটস্থ নাগরিক হাসপাতালে নিয়ে যাই। রাকিবের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলে। এরপর ঢাকা মেডিকেলে নিলে রাকিব সেখানে মারা যায়।
পরবর্তীতে আমি সোস্যাল মিডিয়া এবং সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে জানতে পারি বিজিবির রেদোয়ান, পুলিশের রাশেদ এবং ওসি মশিউর ওইদিন ছাত্রজনতার উপর গুলি করেছে, যার ফলে রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আমি এই তিনজনসহ তাদের উপরে এবং নিচে যারা রাকিবের হত্যার সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার চাই।
এই মামলঅপর আসামিরা হলেনÑমেজর রাফাত বিন আলম, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান।