হোম > শিক্ষা

উচ্চশিক্ষায় স্কিল-গ্যাপ: ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার দূরত্ব

আমার দেশ অনলাইন

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি দক্ষ, সৃজনশীল ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরির প্রধান ভিত্তি। আধুনিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য উচ্চশিক্ষার গুণগত মান এবং সময়ের চাহিদার সাথে এর সামঞ্জস্য থাকা অপরিহার্য। তবে বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা 'স্কিল-গ্যাপ' বা দক্ষতার ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর মূলে রয়েছে ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প খাতের চাহিদার সাথে একাডেমিয়া বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম ও শিখন পদ্ধতির একটি অদৃশ্য দূরত্ব। যখন একজন গ্র্যাজুয়েট দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে পা রাখেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তাত্ত্বিক জ্ঞানে তিনি অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের কারিগরি দক্ষতা বা আচরণগত বৈশিষ্ট্যে তিনি বেশ পিছিয়ে আছেন। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্য নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্যও এখন সময়ের দাবি।

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার এই দূরত্বের গভীরে তাকালে দেখা যায়, পাঠ্যক্রমের সাথে সমসাময়িক বাজারের অসংলগ্নতা একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে প্রযুক্তি ও কর্মপরিবেশ প্রতিনিয়ত ভোল পাল্টাচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স বা অটোমেশনের প্রভাবে অনেক সনাতনী কাজের ধরণ আমূল বদলে যাচ্ছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম অনেক ক্ষেত্রেই এই গতির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে যা শিখছেন, তার একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করার সুযোগ থাকছে না। অন্যদিকে, শিল্প খাত যখন নতুন কোনো প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, সেই প্রযুক্তি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা পেতে পেতে অনেকটা সময় পার হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং কার্যকর আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগের মতো 'সফট স্কিল' গুলোর ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক পড়াশোনার চাপে এই প্রায়োগিক ও আচরণগত দিকগুলো অবহেলিত থেকে যায়, যা পরবর্তী জীবনে পেশাদারিত্বের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই দূরত্ব ঘোচাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে একটি সুদৃঢ়, গভীর ও টেকসই নেটওয়ার্ক তৈরি করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভার আয়োজন করা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠন করা। পাঠ্যক্রম প্রণয়ন বা পরিমার্জনের সময় যদি ইন্ডাস্ট্রির দক্ষ পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই বাজারের চাহিদা ও কাজের ধরণ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা পাবেন। এটি এক ধরনের অংশীদারিত্বমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি শেষ করার আগেই জানবেন কর্মক্ষেত্রে তাকে কোন কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিতভাবে ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট বা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা থিওরি ক্লাসের পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজের বাস্তব পরিবেশ দেখে উৎসাহিত হতে পারে। এতে তাদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং কর্মক্ষেত্রের নৈতিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে।

ব্যবহারিক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের কাঠামোগত ও গুণগত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। স্নাতক পর্যায়ের শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত এক সেমিস্টার বা তিন থেকে ছয় মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে এই ইন্টার্নশিপ যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সনদ প্রাপ্তির গতানুগতিক প্রক্রিয়া না হয়, সেদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান-উভয়কেই সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা সেখানে কাজ শেখার প্রকৃত সুযোগ পায় এবং বাস্তব প্রজেক্টে সরাসরি যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যারিয়ার সার্ভিস সেন্টার বা ক্যারিয়ার ক্লাবগুলোর ভূমিকা আরও জোরালো করা দরকার। এসব প্ল্যাটফর্‌ম থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য মক ইন্টারভিউ, রেজ্যুমে রাইটিং, প্রফেশনাল ইটিকেট এবং লিডারশিপ ট্রেনিংয়ের মতো বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। একইসাথে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু চাকরি খোঁজা নয়, বরং উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে, যা তাদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করবে।

শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রি এক্সপোজারও এই ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। যদি শিক্ষকরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বল্পমেয়াদি ফেলোশিপ বা কনসালটেন্সি প্রজেক্টে যুক্ত হতে পারেন, তবে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষার্থীদের আরও কার্যকরভাবে দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হবেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইন্ডাস্ট্রি-ফান্ডেড রিসার্চ বা শিল্প খাতের অর্থায়নে গবেষণার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে শিখবে, তেমনি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত নতুন উদ্ভাবনের সুফল পাবে। এটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটি দ্বিমুখী লাভের পরিবেশ তৈরি করবে। প্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি নিশ্চিত করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য। বিশেষ করে জটিল সফটওয়্যারের ব্যবহার, অনলাইন কোলাবরেশন টুলস এবং ডিজিটাল ম্যানেজমেন্টের সাথে শিক্ষার্থীদের সখ্যতা থাকা প্রয়োজন।

স্কিল-গ্যাপ বা দক্ষতার এই ব্যবধান দূর করা কোনো একক পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি সুসমন্বিত প্রক্রিয়ার অংশ যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদের শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের দক্ষতায় গড়ে তোলার ব্রত নেবে এবং শিল্প খাত যখন সেই সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্য নিজেদের দ্বার উন্মোচন করে যথাযথ মেন্টরশিপ প্রদান করবে, তখনই একটি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে। আমাদের মেধা ও জনশক্তির অভাব নেই, অভাব কেবল সঠিক সমন্বয় ও সুযোগের। জ্ঞান ও কর্মের এই সেতুবন্ধনই আগামীর সমৃদ্ধ ও স্মার্ট প্রজন্ম গড়ার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের যখন প্রয়োজনীয় দক্ষতায় শাণিত করা যাবে, তখন তারা কেবল দেশের ভেতরে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হবে। শিক্ষা ও শিল্পের এই কার্যকর মেলবন্ধনই শেষ পর্যন্ত জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান সোপান হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই রূপান্তর কেবল গুটিকতক মানুষের জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে।

লেখক: মো. সালমান সাদেকীন চয়ন, সহকারী পরিচালক, তথ্য ও প্রকাশনা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

তাপপ্রবাহের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু শিক্ষার্থীরা

জানা গেল শাহবাগে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী ছাত্রদল নেতাদের পরিচয়

শাহবাগে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, আহত ১০

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত রাখতে আইনি নোটিশ

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রথম নারী ডিজি

শাহবাগে ডাকসু নেতা যুবায়ের-মুসাদ্দিকের ওপর ছাত্রদলের হামলা

এসএসসির দ্বিতীয় দিনে অনুপস্থিতি ও বহিষ্কার বেড়েছে

খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের হেনস্তার শিকার ঢাবির ৬ সাংবাদিক

উচ্চশিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহারে নীতিমালা

বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় টিকতে বিডিরেনের সেবার প্রয়োজন