কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্বাচনি মনোনয়নপত্রের প্রস্তাবক ছিলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল হক। ওই নেতার প্রভাব খাটিয়ে ডামি নির্বাচনের সময় প্রিসাইডিং অফিসারদের হত্যার হুমকি, কলেজের টাকা আত্মসাৎ, নারী কেলেঙ্কারি, শিক্ষক-কর্মচারীদের হয়রানিসহ তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে ২২টি অভিযোগের ১৬টিই প্রমাণিত হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে।
একই অভিযোগের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত কার্যক্রম চলার শেষ পর্যায়ে কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। তদন্ত কাজে বিলম্ব করার জন্যই মূলত, অভিযুক্ত অধ্যক্ষের তৎপরতায় নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অভিযোগকারী প্রভাষক হুমায়ুন কবীর। তিনি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত শেষ করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অধ্যক্ষের দুর্নীতির খবর কলেজটির পাশাপাশি আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে অধ্যক্ষ আমিনুলের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন ভুক্তভোগী কর্মচারীরা। তারা অধ্যক্ষের অপসারণ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জোরপূর্বক চাকরিচ্যুত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
গত বছরের ১৬ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত তদন্ত কার্যক্রম চালান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) শিক্ষা পরিদর্শক একেএম রাশিদুল হাসান ও অডিট অফিসার ফিরোজ হোসেন। তদন্ত শেষে গত ২ ডিসেম্বর প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে কমিটি। প্রতিবেদনটি অভিযোগকারী শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছেছে।
তবে বেশিরভাগ অভিযোগই মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ আমিনুল হক। তিনি আমার দেশকে বলেন, কলেজের সভাপতি হিসেবে নানকের সঙ্গে তার বিভিন্ন ছবি নিয়ে অপপ্রচার করা হচ্ছে আর কর্মচারীরা অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন। এসব জবাব তদন্ত কমিটিকে দেওয়া হয়েছে। আর বিলম্বিত করার জন্য নয় আস্থাহীনতার কারণে মাউশির তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন চান তিনি। তবে ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদন এখনো না পাওয়ায় অভিযোগের সত্যতা বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
সূত্রমতে, কলেজটির সাবেক প্রভাষক উজ্জ্বল আলী এবং প্রভাষক হুমায়ুন কবীর একই রুমে থাকতেন। উজ্জ্বল আলীর চরিত্রগত সমস্যা ছিল । মহিলা কলেজে চাকরি পাওয়ার পর তার অভ্যাস চরিতার্থ করার নানা কৌশল করতে থাকে। সেটা জানাজানি হয় মিডিয়ার মাধ্যমে। দুইজন একই রুমে থাকার ফলে প্রভাষক হুমায়ুন কবীরকে সন্দেহ করতে থাকে। উজ্জ্বল আলীর সঙ্গে অধ্যক্ষের যোগসাজশ থাকায় তিনি অধ্যক্ষকে দিয়ে প্রভাষক হুমায়ুন কবীরের ওপর নানারকম মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। ফলে হুমায়ুন কবীর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের বিচার চেয়ে আবেদন করেন। তারই ভিত্তিতে তদন্ত করে ডিআইএ।
তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, বাংলাদেশের কোনো কলেজে পরীক্ষার বণ্টন নীতিমালায় অধ্যক্ষ ১৪ শতাংশ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত। পরীক্ষার খরচ দেখিয়ে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা অবৈধভাবে গাড়ির তেল খরচ ও সার্ভিস চার্জ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত। রেজ্যুলেশনে ১৭ লাখ টাকার গাড়ি কেনার কথা থাকলেও ৩৮ লাখ টাকার বিল করে বাকি টাকা আওয়ামী নেতাকর্মীদের পেছনে ব্যয় করার অভিযোগ প্রমাণিত। রেজ্যুলেশনে গাড়ির দুই পাশে কলেজের নাম লেখার কথা থাকার পরও না লিখে নিজের ব্যক্তিগত ও নানকের রাজনৈতিক কাজে কলেজের গাড়ি ব্যবহার করার অভিযোগ প্রমাণিত নয়। হাসিনার ডামি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর কবির নানকের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হিসেবে স্বাক্ষর করেন, গোটা নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে কলেজের গাড়ি নিয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট নিশ্চিত করতে প্রিসাইডিং অফিসারদের হুমকিÑএমনকি কারো ভোটের পার্সেন্টেজ কম হলে চাকরি খাওয়া ও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত।
এতে আরো বলা হয়, নিয়োগবাণিজ্যের জন্য কর্মচারী আনোয়ার, কেরামত ও সাগর রানাদের জোরপূর্বক অব্যাহতি দিয়ে সভাপতি নানকের প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত। গাড়িতে লগবই না রেখে পারিবারিক গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করা, শিক্ষকদের শূন্যপদ না দেখিয়ে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগবাণিজ্য করার অভিযোগ প্রমাণিত। তবে অবৈধ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও বোর্ডের ইন্সপেক্টরের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার কলেজের টাকায় বহন করার অভিযোগ প্রমাণিত নয়। তাছাড়া সভাপতি নানকের প্রভাব খাটিয়ে কলেজ থেকে অবৈধভাবে ১৪৪ পার্সেন্ট ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া, শিক্ষকদের বঞ্চিত করা এবং সরকারি বেসিকের পাশাপাশি অবৈধভাবে বেসরকারি বেসিক নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত। অবৈধ কর্মকাণ্ডে প্রতিবাদ করায় নানকের ভয় দেখিয়ে ছয় বছরে ৬০টি শোকজ দিয়ে শিক্ষকদের মুখ বন্ধ করা চরিত্রহীন নারীবাজির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হয়ে ডিগ্রি পাস কোর্স করার অভিযোগটি প্রমাণিত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর থেকেও বেশি, চাইলেই অধীনস্তদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত। এমপিওভুক্ত কর্মচারী আনোয়ার, কেরামত ও সাগর রানাদের জোরপূর্বক অব্যাহতি দেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সুবিধাবাদী তেলবাজ লোক হওয়ায় কলেজকে আয়নাঘর বানিয়ে এখন আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্রীদের হাত করে নির্যাতনের নতুন যাত্রা শুরু করলেন। পার্থক্য এটুকু আগে ব্যবহার করতেন ছাত্রলীগ আর এখন বৈষম্যবিরোধ নামধারী বৈষম্য সৃষ্টিকারী ছাত্রীদের ব্যবহার করে নিরীহ প্রতিবাদী কণ্ঠরোধ করা। খুনি হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী পিলখানা হত্যার মূলনায়ক নানকের নিয়োগকৃত অবৈধ অধ্যক্ষ রেখে বৈষম্য আবসান করার অভিযোগ প্রমাণিত। একজন নারী কেলেঙ্কারি করবে, আর্থিক অনিয়ম করবে, ঘুস খাবে আর সেগুলো কোনো মিডিয়ায় এলে খতিয়ে দেখা হবে কারা করলো, তার মানে অপরাধ করা দোষ নয়, অপরাধ দেখিয়ে দেওয়া দোষ, এ অভিযোগটিরও প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
এদিকে অধ্যক্ষ আমিনুল হকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করেছে মাউশি অধিদপ্তর। এ বিষয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বেসরকারি কলেজ শাখার চিঠিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৮ ও ১২ আগস্ট প্রভাষক হুমায়ুন কবীরের দুটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা মনোনয়ন করা হয়। ওই কর্মকর্তা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা না করায় হুমায়ুন কবীর নতুন করে কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য মাউশি অধিদপ্তরে আবেদন করেন।
সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৪ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তা মনোনয়ন করা হয়। পরে অধ্যক্ষ আমিনুল হক তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর আবেদন করেন। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিন পুনঃতদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক (কলেজ) এবং সহকারী পরিচালককে (কলেজ) তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।