প্রচলিত শিক্ষাবঞ্চিত নানা বয়সি মানুষের এসএসসি থেকে উচ্চশিক্ষার বিকল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)। উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমী এই প্রতিষ্ঠান।
১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর মাত্র একটি একাডেমিক স্কুলের অধীনে বিএড প্রোগ্রামে ৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যে ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত ক্লাস, নকলের সুযোগসহ নানা সমস্যায় প্রতিষ্ঠানটি যেমন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি, তেমনি শিক্ষার মান নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাউবির ৩০০ কোটি টাকার ফান্ড সরকারি কোষাগারে নেওয়াসহ নানা দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। এরপরও প্রতিষ্ঠানটির সনদ পেতে কর্মজীবী ও বিভিন্ন বয়সি মানুষের কাছে এর চাহিদা ও আগ্রহ বেড়েই চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষার্থীর ৮০ শতাংশই কর্মজীবী বলে জানা গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্যোগসহ প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এমনই প্রেক্ষাপটে আজ ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পার করবে বাউবি। যদিও পূজার ছুটির কারণে আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কোনো আয়োজন নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দিনটিকে স্মরণ করতে আগামী ২৮ অক্টোবর ক্যাম্পাসে র্যালি-আলোচনা সভাসহ নানা অনুষ্ঠান হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রমতে, ঢাকার অদূরে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে অবস্থিত মূল কাম্পাস থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় বাউবির কার্যক্রম। তবে রাজধানীসহ দেশের ১২টি আঞ্চলিক এবং ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের সাতটি দেশে এর শাখা রয়েছে। এসব কেন্দ্র এসএসসি, এইচএসসি থেকে ডিগ্রি, অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল-পিএইচডি ও বিভিন্ন প্রফেশনালসহ সাতটি স্কুলে ৫৫টি প্রোগ্রামে ডিগ্রি দেওয়া হয়।
নিজস্ব কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত প্রায় দেড় হাজার অধ্যয়ন কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয় শিক্ষা কার্যক্রম। এছাড়া অনলাইনেও ক্লাস নেওয়া হয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষার্থী এবং ২১ হাজার শিক্ষক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পৃক্ত। ১৯৯২ সালের সংশ্লিষ্ট আইন অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কর্মকাণ্ড বোর্ড অব গভর্নরস, একাডেমিক কাউন্সিল, স্কুল, পাঠ্যক্রম কমিটি, অর্থ কমিটি প্রভৃতি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী প্রক্রিয়ায় জাতিকে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. এম শমশের আলীর পরিকল্পনায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে বাউবি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে নানা কারণে সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সূত্রমতে, বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন অনেকটা সনদনির্ভর হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োজিতরা তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বা পদোন্নতি পেতে প্রফেশনাল ডিগ্রি নিতেই ভর্তি হন প্রতিষ্ঠানটিতে। তবে শিক্ষার্থীরা যেমন ঠিকমতো ক্লাস করেন না, তেমনি দক্ষ বা মানসম্মত শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে। ক্লাস ঠিকমতো হোক বা না হোক, পরীক্ষায় যাতে সবাই পাস করতে পারে সেজন্য অনেক সময় নকলের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন কেন্দ্রে নকলের মহোৎসবের খবর পাওয়া যায়। পরীক্ষার ফলাফলও খুব বেশি সন্তোষজনক নয়। তা ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও কম সংখ্যক পরীক্ষায় অংশ নেন বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, ডিগ্রি শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষায় নকল বেশি হয়। এসব পরীক্ষা কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে যাতে কেউ ফেল না করে সেজন্য এই সুযোগ করে দেন। অনেকেই বাউবির শিক্ষার্থী বা সনদকে কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করেন।
বাউবি থেকে ২০২১-২০২৩ সাল পর্যন্ত সমাজতত্ত্ব বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী তাসকিনা ইয়াসমিন। প্রতিষ্ঠানটি থেকে দুটি ডিগ্রির সনদ লাভ করায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও এ সময় নানা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, অনার্স-মাস্টার্সে অতিথি শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হয় ক্লাস কার্যক্রম। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ও সিনিয়র শিক্ষকের অভাব দেখা গেছে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো স্কলারশিপ না থাকায় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে বাউবির ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. আহসানুল হাসান বলেন, বাউবির সনদকে ইগনোর করা সংশ্লিষ্টদের মানসিকতার বিষয়। তবে এখানকার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কারণ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমান মানের সনদ পান এখানকার শিক্ষার্থীরা। আগের চেয়ে বাউবিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেকে বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সব উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রের ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, বাউবির বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ জোগান আসে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফি থেকে। বিভিন্ন শ্রেণির নির্ধারিত ফি আরো কমানো উচিত বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সরকারি বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বছর ফি বাড়ানোর যে নিয়ম রয়েছে—সেটা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
বাউবির সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যে উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, নানা কারণে সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত মানের না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশ অগ্রগতি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন, গত মার্চে নিয়োগ পেয়ে তারই ধারাবাহিকতায় কাজ করছেন জানিয়ে ড. ছিদ্দিকুর বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমাতে আমরা বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর আবেদন করেছি। সর্বশেষ ৩২৭ কোটি টাকার বাজেটের পৌনে ৭ শতাংশ সরকারের দেওয়া, বাকিটা শিক্ষার্থীদের ফি থেকে আয় করা বলে তিনি জানান।
নানা উন্নয়নের উদ্যোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, কওমি শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম ও সিলেবাস ঠিক করে এসএসসি ও এইচএসসি প্রোগ্রাম চালু করা হবে আগামী জানুয়ারিতে। এখানকার শিক্ষা কার্যক্রম আইটি বেজড ও বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে।
বাউবির শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ কর্মজীবী জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে বেকার তৈরি করে না, পেশাগত দক্ষতা ও উন্নয়নের জন্য এখানে বিভিন্ন ডিগ্রিতে ভর্তি হন তারা। এসএসসি-এইচএসসি পাস করেও বিভিন্ন কর্মে ঢুকতে পারে শিক্ষার্থীরা। তবে এখানকার ডিগ্রি বা সনদের মান নিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, আবার বেশির ভাগই জানেন না। সেজন্য আমরা বিষয়গুলো প্রচারের চেষ্টা করছি।
নকল বন্ধে নানা উদ্যোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, এখন থেকে ই-হাজিরা এবং ছবিযুক্ত অ্যাডমিট কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। পরীক্ষার সব কার্যক্রম পুরো অটোমেশনে যাচ্ছি। এখানে আর উন্মুক্ত পরীক্ষা হবে না।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যের বিষয়ে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ইউজিসির মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেটি আইন উপদেষ্টার মতামতসহ আবার পাঠাতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে ৩০০ কোটি টাকার বেশি সরিয়ে নেওয়া এবং নিয়োগে অনিয়ম বিষয়ে গঠিত কমিটির কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।