ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফারসি বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় বইছে। অভিযোগ উঠেছে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন ফারসি ভাষা বিশেষজ্ঞের আবেদন উপেক্ষা করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ইরানের আল-জামিয়া আল-মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ শাখার বিতর্কিত এক কর্মকর্তাকে নিয়োগের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভাগটিতে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, যোগ্য প্রার্থীদের আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখিয়ে বিতর্কিত একজন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সুপারিশপত্রও ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
জানা যায়, খণ্ডকালীন শিক্ষক পদে আবেদন করেছেন আল-জামিয়া আল-মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির অন্যতম পরিচালক ড. মাঈন উদ্দিন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া ইরানের কোম শহরে ধর্মীয় শাস্ত্রে পড়াশোনা করলেও ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য কোনো একাডেমিক ডিগ্রি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে আল-জামিয়া আল-মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলাদেশ শাখা বন্ধের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে ইতোমধ্যে উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষক ও প্রতারণার শিকার দাবি করা ড. সামিউল হক সরকার।
ইউজিসিতে দেওয়া অভিযোগে ড. সামিউল হক বলেন, তিনি ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে বাংলাদেশে ফিরে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন। পরে তিনি দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও পরিচালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রচারিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। তার অভিযোগ, প্রায় ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তথ্য গোপন করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেছে বেছে নারী শিক্ষার্থীদের শিয়া মতাদর্শে দীক্ষিত করে বিভিন্ন কৌশলে ইরানে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন বা মদতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। উকিল নোটিসে এটিকে একটি ‘নারী পাচারকারী চক্র’ বলেও উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া অভিযোগপত্রে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথিত ‘মোতা বিবাহ’-এর আড়ালে যৌন শোষণের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ড. মাঈন উদ্দিনকে নিয়োগ দিতে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সুপারিশপত্র পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে খ্যাতিমান ফারসি ভাষাবিদ এবং একই পদের আবেদনকারী অধ্যাপক ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন গ্রহণে বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. আবছার কামাল অনীহা দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদ বলেন, দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণা সম্পন্ন করেও চাকরি পাচ্ছেন না। অথচ বিষয়সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অন্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের চেষ্টা হলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য হতাশাজনক হবে। তিনি বলেন, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সংশ্লিষ্ট সব পদে বিষয়ভিত্তিক যোগ্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব।
অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ড. মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, এসব আজেবাজে কথা। আমরা ২০০৮-০৯ সাল থেকেই এখানে আছি। এ ধরনের কোনো ইস্যুই নেই।
নিজের যোগ্যতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি ইরানে নয় মাসের ফারসি ভাষার কোর্স করেছি। ৪০টির বেশি বই অনুবাদ করেছি এবং অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছি। ভাষা ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার কাজ রয়েছে।
একই পদে আবেদনকারী অধ্যাপক ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ অভিযোগ করেন, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের সময় তার যোগ্যতার ভিত্তিতে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তার নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমি ইংল্যান্ড, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছি। আমার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ফারসি বিভাগকে শক্তিশালী করার সুযোগ দেওয়া উচিত। উপাচার্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাগ্য পরিবর্তনের এই অশুভ প্রবণতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বেরিয়ে আসতে হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. আবছার কামাল বলেন, আবেদন তো যে কেউই করতে পারেন। কাউকে আবেদন করতে আমরা বাধা দিতে পারি না। অভিযোগগুলোর বিষয় আমরা খতিয়ে দেখব।
ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর আবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি ওভার কোয়ালিফায়েড। তাকে দিয়ে আরো উচ্চতর পর্যায়ের কোর্স পড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি।