দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ ও উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) পার করেছে গৌরবের ৭৩ বছর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান রেখে আসছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। পদ্মা তীরের এক কুঠিবাড়ি থেকে দেশের শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টি পদার্পণ করেছে ৭৪ বছরে।
১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে সাত দশকের এই গৌরবময় পথচলায় নানা সাফল্য অর্জিত হলেও এখনো কাটেনি আবাসন সংকট। এছাড়া শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, সেশনজটসহ বিভিন্ন সমস্যা এখনো বিদ্যমান। নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। তবে খুব দ্রুতই সংকটগুলোর সমাধানে কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য বলছে, ১৬১ জন নিয়ে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ হাজারের অধিক। সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১ হাজার ১২ জন শিক্ষক ও বিপুলসংখ্যক গবেষক। ৭৫৩ একরের ক্যাম্পাসজুড়ে ১২টি অনুষদ, ৫৯টি বিভাগ ও ছয়টি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ আধুনিক অবকাঠামো রয়েছে। ১৪টি একাডেমিক ভবন, ১৭টি আবাসিক হল, আন্তর্জাতিক ডরমিটরি, গ্রন্থাগার, আইসিটি সেন্টার, জাদুঘর, স্টেডিয়াম, সুইমিং পুলসহ বিভিন্ন সুবিধাও রয়েছে।
শিক্ষা ও গবেষণায় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গৌরবজনক অবস্থান গড়ে তুলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী মসলিন পুনরুদ্ধার, পানিকে আর্সেনিক দূষণমুক্ত করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গ্রিন চিলি পাউডার ও সজনে পাতার গুঁড়া তৈরি— এসব সাফল্যের অন্যতম। এছাড়া চার সবজি থেকে ক্যানসার প্রতিরোধী গুণ ও তুঁত গবেষণায় ক্যানসার এবং হৃদরোগ প্রতিরোধী আবিষ্কার, পাটের বিকল্প আঁশ উদ্ভাবন, উন্নত প্রজাতির মাছ গবেষণা ও বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের আট প্রজাতি হাওড়ে ফিরিয়ে আনা, বিরল অর্কিড কাঞ্চন, ফুলের জীবন্ত চিত্রকর্ম, মাটি ছাড়া ঘাস ও আনারস চাষে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সফলতা দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এছাড়া লবণ ছাড়া চামড়া সংরক্ষণের টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে দেশে প্রথম সফল গবেষণা করেছেন ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। প্লাজমা টেকনোলজি ব্যবহার করে কৃষি ক্ষেত্রে ফসল উৎপাদনে সাফল্য পেয়েছেন ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ তালুকদার। পদার্থবিদ্যায় রাবির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাকেরও রয়েছে সফলতা। সম্প্রতি মুরগির সংক্রামক রোগ রানীক্ষেত প্রতিরোধে কার্যকর তাপমাত্রা সহনশীল ভ্যাকসিন আবিষ্কারে প্রথমবারের মতো সফল হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শশী আহমেদ।
এদিকে গবেষণায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদা পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সবশেষ ইউএস নিউজ বেস্ট গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মধ্যে দেশসেরা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েবমেট্রিক্সের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এছাড়া গত বছর যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল নেচার ইনডেক্স র্যাংকিংয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মধ্যে গবেষণায় শীর্ষস্থান দখল করেছে।
প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ বছরের গৌরবময় ইতিহাস আমাদের জন্য গর্বের। তবে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা, আবাসন সংকটের সমাধান এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।’
আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি ক্যাম্পাসে পরিণত হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে শিক্ষা এবং গবেষণার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে যাবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এএইচএম খুরশীদ আলম বলেন, ‘বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান তৈরি করেছে। তবে আমাদের দায়িত্ব হলো এগুলোকে আরো উন্নততর করা। এছাড়া যেসব সংকট রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া।’
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসিক সুবিধা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, গবেষণার মান উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’
৭৩ বছরের গৌরবময় পথচলা শেষে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।