মাত্র ৫৭ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের জেরে টানা ২০ দিন ধরে অচল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহাল ও নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন ভিসি নিয়োগের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে।
এ পরিস্থিতির সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের খবর নেই। শুধু চুয়েট নয়, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে অস্থিরতা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করানোর ঘটনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে উপাচার্যরা সাধারণত চার বছরের জন্য নিয়োগ পান। রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে নানা কারণে নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই নির্ধারিত মেয়াদ পূরণের সুযোগ পাচ্ছেন না। ইচ্ছেমত যখন-তখন ভিসি পরিবর্তন করার ঘটনা ঘটছে। কখনো আন্দোলন ও প্রশাসনিক সংকট, কখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান সরকারের গত সাত মাসে এ নিয়ে বিতর্ক আরো বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া উপাচার্যদের অব্যাহতির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজনকেও অল্প সময়ের মধ্যে সরানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্যটিতে বদলি করা হয়েছে। উপাচার্যের পাশাপাশি সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদেও পরিবর্তন এসেছে। এসব নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজ করার এবং নির্ধারিত মেয়াদ পূরণের সুযোগ দেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
মেধার প্রতিশ্রুতি, নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ
সূত্রমতে, পতিত স্বৈরাচার সরকারের আমলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় তুলনামূলক অযোগ্যদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় কয়েকজন উপাচার্য ও শিক্ষকের ফ্যাসিস্ট ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার এক মাসের মাথায় আবার উপাচার্য পরিবর্তন শুরু হয়। গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) আট বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, নতুন ৯টিসহ দেশে বর্তমানে ৬২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কয়েকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের উপাচার্যদের সরিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদেও পরিবর্তন এসেছে। এসব নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ রয়েছে।
সূত্রমতে, জুলাই বিপ্লবে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার অন্যতম প্রত্যাশা ছিল কোটা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মেধার মূল্যায়ন। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও মেধার মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সে ইশতেহার কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল মেধা। সেই মেধাকে উপেক্ষা করে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া ঠিক নয়। আরো বিচক্ষণতার সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলছে। তাই মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। দেশের পরিবর্তনে যাদের ত্যাগ রয়েছে, তাদের মধ্যে বিভেদ না করে সমঝোতার পরিবেশ তৈরিরও পরামর্শ দেন তিনি।
উপাচার্য নিয়োগে উপযুক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক ফায়েজ বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর নিজেদের মতাদর্শের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তবে নিয়োগ পাওয়ার পর উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নেই মনোযোগ দিতে হবে। পদটির জন্য আগ্রহী বা তদবিরকারীদের যোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের অন্তত একটি মেয়াদ পূরণের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করেন তিনি।
পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে ভিসি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সরকারদলীয় লোকদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ভিসিকে পদত্যাগ করানোর ঘটনাও ঘটেছে। গত ৬ অক্টোবর বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের কার্যালয়ে ঢুকে তাকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করেন এবং কক্ষটিতে তালা লাগিয়ে দেন। এ ঘটনায় মামলার পর বিএনপির স্থগিত কমিটির এক নেতাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কক্ষের তালা খুলে উপাচার্যকে আবার কার্যালয়ে বসানো হয়।
৫৭ দিনে ভিসি পরিবর্তন, অচল চুয়েট
চুয়েটে উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম গত ২৭ জুলাই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। পরদিন দায়িত্ব নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন। চার বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও ৫৭ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই দিন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহাল এবং চুয়েট থেকেই উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। নিয়োগের চার দিন পর অনলাইনে যোগ দিলেও নতুন উপাচার্য এখনো ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি।
অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের পাশাপাশি ভবিষ্যতে চুয়েটের শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতি। গত বৃহস্পতিবার সমিতির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভাপতি অধ্যাপক ড. আহসান উল্লাহ বলেন, সাধারণ সভায় এ দাবির বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। গতকাল রোববারও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে অনড় ছিলেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর চুয়েটের অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। এক বছর ৯ মাসের মাথায় তাকে সরিয়ে অধ্যাপক সায়েমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
চলমান অচলাবস্থার মধ্যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরিফুল আলম যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমানকে ১১ ও ১২ অক্টোবর দুদিনের জন্য উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এড়িয়ে তাকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ আছে কি না জানতে চাইলে গতকাল মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিকও একই কথা জানান।
স্বল্প সময়ে যত ভিসি পরিবর্তন
বর্তমান সরকারের সময়ে গত ১৪ মে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের আত্মীয় হওয়ায় সমালোচনা শুরু হয়। এক ঘণ্টার মধ্যেই নিয়োগটি বাতিল করা হয়।
একই দিন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়া। দায়িত্ব গ্রহণের ২৩ দিনের মাথায় তাকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে সাত মাসের মধ্যে তিনবার উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে সাত কলেজ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য হিসেবে বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাছিবকে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি চার বছরের জন্য তার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু নতুন সরকার ১৬ মার্চ তাকে অব্যাহতি দিয়ে জাবির অধ্যাপক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে নিয়োগ দেয়। তিনি ১ এপ্রিল দায়িত্ব নেন। ছয় মাসের মাথায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাকে সরিয়ে জাবির উপাচার্য করা হয়। একই দিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নতুন উপাচার্য নিয়োগ পান। নতুন নিয়োগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিবৃতি ও মিছিল করে।
জাবির উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ পান। বিএনপি ঘরানার এই শিক্ষককেও দুই বছরের মাথায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর সরিয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাবির অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। দেড় বছরের মাথায় গত ১৬ মার্চ তাকে ঢাবির উপাচার্য করা হয়। একই দিন ঢাবির অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
এছাড়া ২০২৩ সালে অনুমোদিত আট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য বেশ কয়েকটিতে উপাচার্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকার সেখানেও পরিবর্তন আনছে। কয়েকটিতে আবার প্রথমবারের মতো ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (আগের নাম মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয়) প্রথম উপাচার্য হিসেবে ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবিউল ইসলাম নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন এ দায়িত্ব পান। ২০২৬ সালের ৭ জুন তাকে সরিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোজাম্মেল হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বগুড়া ও নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা বহাল আছেন।
নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও বর্তমান সরকার উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে।
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন বিভাগের শিক্ষক
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, এমন শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ১৪ মে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। একই দিন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবিএম শহীদুল ইসলাম।
গত ৮ জুন পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ছবিরুল ইসলাম হাওলাদারকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তার নিজ বিভাগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছিল।
এছাড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া নিয়েও ক্ষোভ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ডুয়েট থেকেই উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন।
আইনে এ ধরনের নিয়োগে বাধা না থাকলেও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
নিয়োগে অকার্যকর সার্চ কমিটি
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা পরিত্যক্ত হয়।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০২৫ সালের ১৮ মে অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিটির সুপারিশ ছাড়া এ প্রক্রিয়া আর অনুসরণ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমান সরকারের সময়ে গত ১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করে। ছয় সদস্যের এ কমিটির সভাপতি করা হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে।
ঢাবি, রাবি, চবি ও জাবির আইনে সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগের বিধান রয়েছে। বাস্তবে এ প্রক্রিয়াও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না বলে অভিযোগ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতেই মূলত রাষ্ট্রপতি উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেন। এক্ষেত্রে সার্চ কমিটির কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
উপাচার্য নিয়োগে ইউজিসির ভূমিকা আছে কি নাÑজানতে চাইলে সংস্থাটির সচিব ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে ইউজিসির কোনো ভূমিকা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ ও পরিবর্তন নিয়ে অস্থিরতা প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের (ইউটিএল) সাংগঠনিক সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিলাল হোসাইন বলেন, উপাচার্য নিয়োগে একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাই নিয়োগের প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে। নিয়োগবাণিজ্য নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের কারণে ভিন্নমতের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে উপাচার্যদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক উপাচার্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। অন্যদিকে তাদের ভুল সিদ্ধান্তও অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে। ফলে নিয়োগের পর তাদের সরিয়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের মন্তব্য জানার চেষ্টা করেও গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন গত শনিবার বলেন, উপাচার্য নিয়োগের কাজ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়। চুয়েটের পরিস্থিতি ও উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।