উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) প্রতিষ্ঠা করা হলেও কার্যত প্রতিষ্ঠানটি উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা।
এমনকি পলাতক শেখ হাসিনার পতনের দুই বছর পরও ওই আমলে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও বহাল ছিলেন। তবে অতিসম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিতে ফ্যাসিবাদী সরকারের নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সরিয়ে দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে চেয়ারম্যান ও সদস্যপদে পরিবর্তন এলেও আওয়ামী লীগ আমল থেকে চলে আসা কর্মকর্তারাই বহাল রয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বাইরে প্রতিষ্ঠানটির মূল কর্মকর্তারা শিক্ষা ক্যাডার থেকে প্রেষণে প্রতিষ্ঠানটিতে পদায়ন পান। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষা ক্যাডারের ১৫ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন, যাদের অর্ধেকের বেশি আওয়ামী লীগ আমল থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রেষণে কর্মরতদের সাধারণত তিন বছর পর বদলি করা হলেও তারা নানাভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে প্রতিষ্ঠানটিতে রয়ে গেছেন।
এ কর্মকর্তাদের অনেকেই ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল ও দীপু মনির সঙ্গেও যুক্ত। এমনকি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন বিএসির পরিচালক (কিউএ অ্যান্ড এনকিউএফ) প্রফেসর মোহাম্মদ তাজিব উদ্দিন। তিনি ২১তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী সমর্থিত প্যানেল থেকে শিক্ষা ক্যাডার সমিতির নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর স্ত্রী ও মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগ আমলের পুরো সময় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও বিএসিতে কর্মরত ছিলেন।
বিএসির পরিচালক (অর্থ, পরিকল্পনা ও আইসিটি) প্রফেসর গৌতম চন্দ্র রায়ও রয়েছেন এ তালিকায়। তিনি ১৮তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীর আত্মীয়।
বিএসির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রফেসর মুনিরুল ইসলাম। তিনি ১০ শতাংশ কোটার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি সাত বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বিএসিতে তার দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
উপপরিচালক স্নিগ্ধা বাউলকে নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে তার একাধিক ছবি রয়েছে। সাবেক মুখ্য সচিব কামাল চৌধুরীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি চাকরির পুরো সময় ঢাকায় পদায়নে ছিলেন।
এছাড়া বিএসির উপপরিচালক প্রবীর কুমার চক্রবর্ত্তী, ড. রীতা পারভীন, মোহাম্মদ আবু জাফরের বিরুদ্ধেও আওয়ামীপন্থি রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুধু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নয়, উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে তদারকিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কোনো গবেষণাকর্মও পাওয়া যায়নি। বিএসির পরিচালক প্রফেসর গৌতম চন্দ্র রায়, উপপরিচালক ড. রীতা পারভীন, উপপরিচালক স্নিগ্ধা বাউল, মোহাম্মদ আবু জাফরের কোনো প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ কিংবা গবেষণা কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিএসির পরিচালক (কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স) প্রফেসর মোহাম্মদ তাজিব উদ্দিনের নামে রিসার্চগেট, গুগল স্কলার, সিমেন্টিক স্কলারে তার প্রোফাইল পাওয়া না গেলেও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির জার্নালে মাত্র দুটি প্রবন্ধ পাওয়া যায়। বিএসি সচিব প্রফেসর মুনিরুল ইসলামের নামে তিনটি যৌথ গবেষণা প্রবন্ধ পাওয়া গেলেও রিসার্চগেট, গুগল স্কলারে তার কোনো প্রোফাইল পাওয়া যায়নি আর উপপরিচালক প্রবীর কুমার চক্রবর্ত্তীর মাত্র দুটি গবেষণা প্রবন্ধ পাওয়া যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর অবশ্য সরকারি কর্মকর্তাদের ‘দলীয়’ পরিচয়ে বিবেচনা করতে চান না। তিনি মনে করেন, কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন বা পদোন্নতি সবক্ষেত্রেই দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় কোনো কর্মকর্তার দলীয় পরিচয় প্রকাশ করে কাজ করার কিংবা বাড়তি সুযোগ নেওয়ার অধিকারও নেই। অতীতে নির্দিষ্ট দলের পরিচয় দিয়ে অনেক ব্যক্তিই সুবিধা পেয়েছেন বা সুবিধা নিতে দল করেছেন। অথচ কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, মজার ব্যাপার হলো, এ ধরনের সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ নির্ধারিত যোগ্যতার জায়গা থেকেই পিছিয়ে। তাই নতুন সরকারের উচিত হবে এ ধরনের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিতে দ্বিধা না করা এবং যথার্থ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া। যেকোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে প্রধান মাপকাঠি না করলে দপ্তর, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একই সঙ্গে অনিয়ম বা দুর্নীতি বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আখতার হোসেন খান আমার দেশকে বলেন, আমার এখান থেকে কিছু করার সুযোগ নেই। এসব কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে, নেওয়ার মালিকও তারা, যা করার মন্ত্রণালয় করবে।
এসব বিষয়ে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেককে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি।