এইচএসসি ও সমমানের ফলাফলে হতাশ না হয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোর অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
তিনি বলেন, যেসব কলেজের শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে বসে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ বের করা। কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না বরং তাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে হবে।
কলেজের নিয়মিত সময়ের বাইরে এবং শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব বিষয়ের শিক্ষকদের বাড়িয়ে দেওয়া সময়ে শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে হবে।
শনিবার ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ফলাফল বিশ্লেষণ ও করণীয় বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
এবারের পাসের হার কমে যাওয়াকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছেন না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উপাচার্য। তার মতে, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তার সাময়িক প্রভাব পড়েছে পাসের হারে। তবে আগামী পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার আবার বেড়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদী।
ফলাফলে পাসের হার কমা প্রসঙ্গে ড. আমানুল্লাহ বলেন, এইচএসসি পরীক্ষায় যে ফলাফল হয়েছে, সেটিকে আমি ফল বিপর্যয় মনে করি না, বরং স্বাভাবিক ফলাফলই বলব। শিক্ষার্থীদের যেভাবে শেখানো, গাইড করা এবং গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা দরকার ছিল, হয়তো আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করতে পারিনি। এ জন্য শিক্ষার্থীদের দোষ দিতে চাই না; আমাদের অক্ষমতাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পাস কোর্স ও প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স পরীক্ষায় পাসের হার অর্ধেকের নিচে নেমেছে এবং অনার্স পরীক্ষায় পাসের হারও ৬০ শতাংশের নিচে রয়েছে। খাতা মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া, পুনর্মূল্যায়ন এবং শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার কারণেই ফলাফলে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই পরীক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে দ্রুত অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রফেসর আমানুল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না। বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ কখনো ছিল না। এ বছর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই পদ্ধতি চালু করেছেন, এতে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে উপকৃত হবে। আমি মন্ত্রীকে এজন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।
বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ এবং খাতা পুনর্মূল্যায়নের ফলে আরও অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এসব প্রক্রিয়া শেষে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো বিবেচনা করে শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে বিনা সম্মানীতে অতিরিক্ত পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে হবে। আগামী এক–দুই মাস শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করলে অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হতাশ হওয়ার কিছু নেই।”
ভিসি বলেন, সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। এ সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে পাসের হার কমলেও ভবিষ্যতে এসএসসি, এইচএসসি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় শিক্ষার মান ও পাসের হার উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।