প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে জীবনানন্দ দাসের কবিতা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’। মুক্তির পরপরই চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিশেষ শ্রেণির দর্শকমহলে প্রশংসার সাড়া মিলছে। অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও লেখকদের অনেকেই ছবিটি নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন।
নির্মাতা ও কলাকুশলীরাও প্রচারণার অংশ হিসেবে এক হল থেকে আরেক হল ছুটে বেড়াচ্ছেন। এবার সিনেমাটি দেখতে হলে এলেন নির্মাতার ৭৫ বছর বয়সি মা। প্রায় ৫৫ বছর পর তিনি বড় পর্দায় কোনো চলচ্চিত্র দেখলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে তিনি উপভোগ করেন ছেলের নির্মিত এই সিনেমা। এতেই স্মৃতির ডালা খুলে বসেছেন নির্মাতা।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার মা খুব বেশি তার কাজ দেখেননি। এমনকি তার প্রথম চলচ্চিত্র ঊনপঞ্চাশ বাতাসও আগে দেখা হয়নি। তবে এবার তিনি নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করে ছেলের সিনেমা হলে গিয়ে দেখার ইচ্ছা জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্রের কলাকুশলী ও পরিবারের অন্য কিছু সদস্যও। টিকিট না পাওয়ায় সবাই একসঙ্গে বসতে না পারলেও নির্মাতা আলাদা আসনে বসে সিনেমাটি দেখেন।
তিনি জানান, পর্দায় একটি বিশেষ মুহূর্তে ‘আমার পিতা এম এ কাসেমের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ’ লেখা উঠতেই পুরো পরিবারের আবেগ এক হয়ে যায়। বাবা-মায়ের সাহিত্যপ্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চাই আজকের নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের সৃজনশীলতার ভিত্তি তৈরি করেছে—এমনটাই মনে করেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের মা-বাবার জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন নির্মাতা।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে উজ্জ্বল বলেন, “আমার বাবা ছিলেন আমাদের কবিতার আঁতুড়ঘর। আমার ক্লাস ওয়ান-টুর কথা মনে আছে—আব্বা অফিস থেকে ফিরেই খালি গায়ে লুঙ্গি পরে আমাদের টানা বারান্দায় হাঁটতেন, আমি তর্জনী বাড়িয়ে দিতাম, আমি আব্বার তর্জনী ধরে হাঁটতাম। আর আব্বা খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে একের পর এক কবিতা আবৃত্তি করতেন। আমার প্রিয় ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’। আব্বা যখন চোখ বড় বড় করে বলতেন, ‘বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে’—আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকতাম, উপেনকে দেখতে পেতাম, তার জন্য তখন খুব কষ্ট লাগত।”
তিনি আরো বলেন, আজকের তিনি তার বাবা-মায়ের দেখা সেই দৃশ্যগুলোরই ফল। মায়ের সাহিত্যপ্রেম নিয়েও স্মৃতিচারণ করেন তিনি। তার ভাষায়, মায়ের প্রিয় তিন লেখক ছিলেন শরৎচন্দ্র, নিহাররঞ্জন ও শংকর। ‘অলস দুপুরে সংসারের কাজ শেষ করে মা এলোচুলে বিছানায় শুয়ে শংকরের চৌরঙ্গী পড়তেন—এটা আমার জীবনের খুব প্রিয় একটা দৃশ্য,’ বলেন নির্মাতা। নির্মাতা স্মৃতিচারণ করে জানান, তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে এক সাংস্কৃতিক পরিবেশে। তিনি বলেন, পরিবারজুড়ে ছিল বই, সংগীত, ফটোগ্রাফি ও আলোচনা—যা তার শিল্পবোধ গড়ে তুলেছে।
তিনি জানান, একদিকে মেজ আপা ও সেজ আপা নিয়মিত বই পড়তেন, বড় আপা ইয়াশিকা ক্যামেরায় ফিল্ম লোড করে ছবি তোলার কৌশল শেখাতেন। ছোট আপা রবীন্দ্রসংগীত করতেন। মেজ কাকা প্রতি সপ্তাহে রেডিওর বন্ধুদের নিয়ে গান-বাজনার আসর বসাতেন। ছোট কাকা অবিরামভাবে আইনস্টাইনের নানা আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করতেন। গ্রামে দাদাবাড়িতে গেলে সেজ কাকা খড়ের উঁচু মাচা বানাতেন জোৎস্না দেখানোর জন্য। দাদাকে সারাদিন এক পা দেয়ালে তুলে রেখে নজরুলের গান গাইতে শুনেছেন তিনি।
তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, এখনকার প্রজন্ম কি এমন পারিবারিক সাহিত্য-সংস্কৃতির ভেতর বড় হচ্ছে? তার মতে, ছোটবেলা থেকেই বাবার কবিতা আবৃত্তি, সাহিত্যচর্চা ও পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাকে গড়ে তুলেছে। আর সেই আবহই আজকের সিনেমা নির্মাণের পেছনের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ‘আমার জীবনটাই সিনেমার মতো আমি তাহলে কেন সিনেমা বানাব না বলেন!’-নির্মাতা হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা এভাবেই তুলে ধরলেন উজ্জ্বল।