বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অমর ও কালজয়ী অভিনেতা সালমান শাহর জন্মদিন আজ। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মদিনে প্রিয় অভিনেতাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন তার পরিবার, সহকর্মী এবং দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত।
মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ক্ষণজন্মা জনপ্রিয় এই নায়কের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। যা ঢালিউড ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য। আজও খোলেনি সেই মৃত্যুরহস্যের জট। সালমান শাহর অকালমৃত্যুর দীর্ঘ ৩০ বছর পর মামলাটি ‘অপমৃত্যু’ থেকে ‘হত্যা মামলায়’ রূপ নেওয়ায় মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে এক নতুন মোড় এসেছে।
২০২১ সালের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ‘আত্মহত্যা’র চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়। এই হত্যা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দীর্ঘ বছর পলাতক থাকার পর গত আগস্টে অভিনেতা ডনকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। গত ২৭ আগস্ট আদালত ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে সিআইডিকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গত ৯ সেপ্টেম্বর ডনকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠান বিচারক। সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে ডনের জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।
সিআইডি মামলাটি পুনঃতদন্ত করছে। গত আগস্টের নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ ধার্য করেছে।
কেন এত বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা অন্য অনেক পুরোনো মামলার চেয়ে আলাদা। কারণ প্রায় ৩০ বছরে এই একটি ঘটনাকে ঘিরে একাধিক তদন্ত হয়েছে, আদালতে হয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং প্রতিটি পর্যায়ে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা। প্রথম তদন্তে সিআইডি সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করে। পরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। প্রায় ১২ বছর পর ২০১৪ সালে দেওয়া সেই তদন্ত প্রতিবেদনেও ঘটনাটিকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এরপর সালমান শাহর মা নীলার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পিবিআইও দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। সংস্থাটি এর পেছনে পারিবারিক কলহসহ পাঁচটি কারণের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু সালমান শাহর পরিবার পিবিআইয়ের সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করে।
এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফলে একই মৃত্যুকে ঘিরে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আইনি অবস্থান। এর আগে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই তাদের ৬০০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দীর্ঘ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর পিবিআই জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি। পারিবারিক কলহ, মানসিক চাপ ও অতি-আবেগীয় কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
অভিযুক্তদের দায়মুক্তি
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
আদালতের সর্বশেষ নির্দেশ
পরিবার থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং তদন্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন এবং পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি ও নারাজি আবেদনের আইনি নিষ্পত্তি কার্যক্রম আদালত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার পারিবারিক নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। চিত্রপরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ১৯৯৩ সালে ঢালিউডে তার অভিষেক ঘটে এবং প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেন তিনি।
মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে সালমান শাহ উপহার দিয়েছেন ২৭টি হিট ও ব্যবসাসফল সিনেমা। তার অভিনয়ের সাবলীলতা, স্টাইল, আধুনিক ফ্যাশন ও ভিন্নমাত্রিক ভাবমূর্তি সেই সময়ে ঢাকাই সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। মৌসুমী, শাবনূর, শাবনাজসহ তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সঙ্গে তার জুটি দর্শকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়।