জাতিসংঘের প্রতিবেদন
বর্তমান যুগের একজন মানুষ তার দাদা-দাদির প্রজন্মের তুলনায় গড়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি মুরগির গোশত এবং দ্বিগুণ পরিমাণ শুকরের মাংস খাচ্ছেন।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬০ বছরে বিশ্বব্যাপী গোশত সরবরাহ চার গুণ বেড়েছে এবং এই বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে মাথাপিছু মুরগির গোশতের সরবরাহ ৩ কেজির কম ছিল, যা ২০২২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৭ কেজিতে। একই সময়ে শুকরের মাংসের সরবরাহ দ্বিগুণ হয়ে মাথাপিছু ১৫ কেজি হয়েছে। তবে গরুর গোশতের সরবরাহ মাথাপিছু ৯ কেজিতেই স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় শীর্ষ দূষণকারী খাত হলো কৃষি। গোশতের সরবরাহ ও চাহিদার নিয়ামকগুলোর ওপর এফএও-র বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগামী দশকে এই খাত থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকারী গ্যাস নির্গমন ৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আর এই বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশের জন্যই দায়ী গবাদিপশুর খাত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালে বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু গোশতের গড় সরবরাহ ছিল ২৫ কেজি, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৪৭ কেজি হয়েছে। তবে উৎপাদিত গোশত ও দুধের প্রায় ১৪ শতাংশই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অথবা সুপারশপ ও রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর পর অপচয় হয়।
উপাত্ত অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয়ের তুলনায় প্রাণিজ খাদ্যের দাম অনেক বেশি। অন্যদিকে, ধনী দেশগুলোতে চিকিৎসকেরা এবং জলবায়ু বিজ্ঞানীরা গোশত খাওয়া কমানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
এফএও-র লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট অফিসার এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক ড্যানিয়েলা বাত্তাগ্লিয়া বলেন, ‘আঞ্চলিক বণ্টন এবং গোশত প্রাপ্তির সুযোগ এখনো অত্যন্ত অসমান। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে গোশতের ব্যবহার বেশ উচ্চ এবং স্থিতিশীল হলেও নিম্ন আয়ের দেশগুলো এখনো প্রাণিজ পণ্য কেনার সামর্থ্যের অভাবজনিত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে।’
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে গোশত-নির্ভর ডায়েট থেকে উদ্ভিজ্জ বা প্ল্যান্ট-রিচ ডায়েট বেছে নেওয়াকে অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
গোশত ও দুগ্ধ শিল্পের পাশাপাশি বাইরের শিক্ষাবিদদের দ্বারা পর্যালোচিত এই এফএও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ধনী দেশগুলো প্রাণিজ পণ্যের ‘অতিরিক্ত ব্যবহার’ ত্বরান্বিত করছে, তবে সেখানে তাদের গোশত খাওয়া কমানোর সরাসরি কোনো সুপারিশ করা হয়নি।
স্টকহোম এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বিজ্ঞানী ক্লিও ভেরকুইল (যিনি এই প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, ‘এই প্রতিবেদনে সমস্যাটি স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত করা হলেও মূল উপসংহারে পৌঁছানোর আগেই তা থেমে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মূল সমস্যাটি এর ম্যান্ডেট বা উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে নীতিনির্ধারকদের এটি দেখাতে যে কীভাবে প্রাণিজ খাদ্য স্বাস্থ্যকর ডায়েটে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। খাদ্য-সংকটে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এই চিন্তাধারা সঠিক হতে পারে, কিন্তু ধনী দেশগুলোর জন্য এটি ভুল ভিত্তি, যেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত কারণে গোশতের ব্যবহার কমানো জরুরি।’
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির খাদ্য ব্যবস্থা বিষয়ক গবেষক ম্যাথিউ হায়েক বলেন, এই প্রতিবেদন ধনী দেশগুলোতে উচ্চ মাত্রায় গোশত ব্যবহারের প্রভাব এবং তা কমানোর জলবায়ুগত সুবিধাগুলোকে ‘সযত্নে এড়িয়ে গেছে’।
তিনি বলেন, ‘লেখকেরা পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে কেবল ভোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি বা ভবিষ্যৎ গবেষণার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাদের এই উপস্থাপনা জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলোকে আড়াল করে, যা দেখায় যে উচ্চ মাত্রায় গোশত খাওয়া পরিবেশের ক্ষতি করে এবং স্বাস্থ্যের নানা ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত।’
মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে প্রাক-শিল্পায়নের যুগের তুলনায় পৃথিবীর তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অ্যানিম্যাল এগ্রিকালচার বা প্রাণিজ কৃষি এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ১২ থেকে ২০ শতাংশ দায়ী এবং এটি জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে বাত্তাগ্লিয়া বলেন, এফএও-র কাজ প্রমাণ-ভিত্তিক এবং ভিন্ন বিজ্ঞানীদের মতামত ভিন্ন হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের প্রতি তাদের বার্তা হলো-গবাদিপশু কমানো নয়, বরং গোশত উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মতো সমস্যাগুলো কমিয়ে আনা।
তিনি বলেন, ‘নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও জ্ঞান আমাদের রয়েছে। এটি মূলত একটি ভারসাম্যের বিষয়। পুষ্টির উৎস হিসেবে প্রাণিজ খাদ্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ, তাই এর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে ইতিবাচক দিকটিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এএম