ইমামবাড়া অর্থ ‘ইমামের বাসভবন’। তবে পারিভাষিক অর্থে ইমামবাড়া হলো শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সমাবেশ এবং শোক ও মাতমের স্থান। মূলত কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তার পরিবারের শাহাদাতের স্মরণে মহররম মাসে আশুরার শোক পালন, মজলিস ও তাজিয়া মিছিলের জন্য এই ভবনগুলো ব্যবহৃত হয়।
এ ধরনের স্থাপনা ইরান ও ইরাকে প্রথমে ‘হোসেনিয়া’ এবং পরে ‘তাকিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে এসে সেগুলো ‘ইমামবাড়া’, ‘আশুরাখানা’ বা ‘আজাখানা’ নামে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। দশম শতকের শেষদিকে বাগদাদ, আলেপ্পো ও কায়রোর মতো শহরে মসজিদের বর্ধিত অংশ হোসেনিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
আহমেদ দীন রুমি অনূদিত হাকিম আহসান জাহাঙ্গীরনগরীর ১৯২৩ সালের একটি প্রবন্ধে দেখা যায়, হাকিম আহসান বলছেন, “দাক্ষিণাত্যের কথা বাদ দিলে হিন্দুস্তানে একটা বিষয়ে গৌরবের অধিকার কেবল ঢাকার। এখানেই অবস্থিত প্রাচীনতম ইমামবাড়া ‘হোসেনী দালান’।”
হোসেনী দালান সম্পর্কে তার এই বক্তব্য যে অত্যুক্তি নয়, তার প্রমাণ ইতিহাসেই পাওয়া যায়। হোসেনী দালান প্রতিষ্ঠার একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে নাজির হোসেন রচিত ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে। কথিত আছে, ১৬৪২ সালে শাহ সুজার শাসনামলে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক ও শিয়া দরবেশ মীর মুরাদ স্বপ্নে ইমাম হোসেন (রা.)-কে দেখেন। ইমাম হোসেন (রা.) তার শাহাদাতের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য একটি মর্সিয়া গৃহ নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মীর মুরাদ বখশীবাজার এলাকায় সেই মর্সিয়া গৃহ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সেটিই আজকের হোসেনী দালান।
তবে ভবনটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মীর মুরাদের নির্মিত ভবনটি কয়েকবার আমূল সংস্কার করায় এর আদি রূপ আর নেই। হোসেনী দালানের শিলালিপিতে মীর মুরাদ ও ১৬৪২ সালের উল্লেখ থাকলেও অনেকে এই তথ্য মানতে নারাজ।
‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া লিখেছেন, ‘কেউ কেউ শিলালিপিটিকে জাল মনে করেন। তাদের যুক্তি, মীর মুরাদ ১১৭ খ্রিষ্টাব্দে মারা গেলে তার পক্ষে এর ৭৫ বছর আগে ভবনটি নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না।’
তবে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া এই সংশয় নিরসনের চেষ্টাও করেছেন। শিলালিপিটি পরীক্ষা করে তিনি এটিকে জাল বলে মনে করেননি। তার বক্তব্য হলো—‘১৭১৭ সালে মীর মুরাদ নামে কোনো নৌ-সেনাপতির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তিনিই যে ১৬৪২ সালের মীর মুরাদ, তার প্রমাণ কোথায়? সম্ভবত ১৬৪২ সালে মীর মুরাদ এখানে ছোট একটি ইমারত নির্মাণ করেছিলেন, যা পরে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করে।’
বখশীবাজারের হোসেনী দালানের নির্মাণকাল নিয়ে সংশয় থাকলেও ঢাকায় এর আগেও ইমামবাড়া নির্মিত হয়েছিল। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ আহমদ হাসান দানীর মতে, পুরান ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন ইমামবাড়া হলো বর্তমান ফরাশগঞ্জের ‘বিবি-কা-রওজা’। আমীর খান ১৬০০ সালে, ইসলাম খাঁর ঢাকায় আগমনেরও আগে, এটি নির্মাণ করেছিলেন। এই তথ্য সত্য হলে ঢাকার ইমামবাড়ার ইতিহাস বখশীবাজারের হোসেনী দালানের চেয়েও পুরোনো।
মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছেও একটি হোসেনী দালান ছিল। ১৮৬৯ সালের ঢাকার মানচিত্রে সেটিকে ‘পুরোনো হোসেনী দালান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ছোট কাটরা ও মীর মুকিম কাটরায়ও আরো দুটি পুরোনো হোসেনী দালান ছিল। তবে বর্তমানে যে হোসেনী দালানটি আমাদের কাছে পরিচিত, সেটি উনিশ শতকে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কিন্তু উনিশ শতকের বহু আগে থেকেই এই স্থাপনা শিয়া সম্প্রদায়ের কেন্দ্র ছিল, তার কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ যদুনাথ সরকারের লেখায় পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘আওরঙ্গজেবের দরবারে আলোচনা হতো যে শাহ সুজা শিয়া হয়ে গেছেন। এমন ধারণার কারণ ছিল, সুজার ঘনিষ্ঠদের অধিকাংশই ছিলেন পারস্যের অধিবাসী ও শিয়া মতাবলম্বী। শাহজাদা সুজা বাংলার সুবাদার হয়ে ঢাকায় আসার সময়ও তার সঙ্গে বহু পারস্যবাসী শিয়া ঢাকায় এসেছিলেন।’
হোসেনী দালানের নির্মাতা মীর মুরাদও যে এই দলেরই একজন ছিলেন, তা অনুমান করা যায়। হোসেনী দালানের কাছাকাছি সময়ে, ১৬৪০ সালে, শাহ সুজার দেওয়ান মীর আবুল কাসেম ঢাকায় একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন। সেটিই বর্তমানে ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ নামে পরিচিত।
বর্তমানে হোসেনী দালান থেকে বের হওয়া তাজিয়া মিছিল বিভিন্ন পথ ঘুরে এই ঈদগাহের কাছাকাছি গিয়ে শেষ হয়। স্থাপনা দুটির নির্মাণকাল এবং তাজিয়া মিছিলের শুরু ও শেষের স্থান থেকে ধারণা করা যায়, শাহ সুজার সময় থেকেই হোসেনী দালান শিয়া সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ‘মুঘল যুগে ঢাকা’ গ্রন্থে শেখ মাসুম কামাল লিখেছেন, ‘সুজা ঢাকায় মহররম উদ্যাপন ও তাজিয়া মিছিলের প্রবর্তক।’ সময়ের পরিক্রমায় এর বৈভব হয়তো কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে; কিন্তু ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
মোগল আমল পেরিয়ে ব্রিটিশ আমলেও এই গুরুত্ব টিকে ছিল। ১৮৩২ সালে জেমস টেলর লিখেছিলেন, ঢাকায় মুসলমানদের উপাসনা ও ধর্মীয় সমাবেশের প্রধান দুটি স্থান ছিল ধানমন্ডির ঈদগাহ এবং হোসেনী দালান।
ইতিহাসের কালপর্ব পেরিয়ে আজও মহররম এলে ঢাকার হোসেনী দালান হয়ে ওঠে কারবালার শোক ও স্মৃতির কেন্দ্র। এখান থেকে বের হওয়া তাজিয়া মিছিলে মাতম ও শোকধ্বনির সঙ্গে পথ চলে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর রওজার প্রতিরূপ। পুরান ঢাকার পথ ধরে এগিয়ে চলা এই মিছিল যেন শতাব্দী পেরিয়ে কারবালার বেদনাকেই বহন করে।