হোম > ফিচার

ঢাকার কয়েকজন সুফি সাধক

মুহাম্মাদ রাহাতুল ইসলাম

ঢাকা শহরের অলিগলি, পুরোনো সব পাড়া-মহল্লা আর কোলাহলপূর্ণ রাজপথের আড়ালে লুকিয়ে আছে রুহানিয়াতের অনালোচিত অধ্যায়। শত শত বছর আগে এ শহরে পা রেখেছিলেন অনেক সুফি-সাধক, পীর-মাশায়েখ যারা দূরদূরান্ত থেকে ইসলামের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। ‘বাংলাদেশে শুধু বড় বড় শহরই নয়, এমন কোনো গ্রাম কিংবা শহর নেই, যেখানে পুণ্যাত্মা সুফিরা গমন করেননি ও বসতি স্থাপন করেননি।’ স্বনামধন্য সুফি শেখ আলাউল হকের প্রসিদ্ধ শিষ্য মীর সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানি (মৃত্যু ১৩৮০ খ্রি.) জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শরকিকে পাঠানো চিঠিতে এই কথা লিখেছিলেন। এই লেখায় আমরা পরিচিত হব ঢাকার এমন কয়েকজন সুফি দরবেশদের সঙ্গে, যারা লোকমুখে এবং ইতিহাসের আজও অমর হয়ে আছেন।

হজরত সুফি মুহাম্মদ দায়েম

আজিমপুরের ঐতিহাসিক দায়রা শরিফের প্রতিষ্ঠাতা সুফি মুহাম্মদ দায়েম চট্টগ্রাম থেকে আঠারো শতকের মধ্যভাগে ঢাকায় আসেন এবং প্রথমে মিয়া সাহেব ময়দানে অবস্থিত পীর হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমলিগোলা অঞ্চলে খান মোহাম্মদ মসজিদে আস্তানা গাড়েন। তার আগমনের সংবাদ পেয়ে রোগমুক্তি ও রুহানিয়াত লাভের আশায় বহু মানুষ ভিড় করতে থাকে। ফলে তিনি আজিমপুরের জঙ্গলঘেরা এলাকায় চলে আসেন, যেখানে ১৭৬৯ সালে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটাই বর্তমানের আজিমপুর দায়রা শরিফ। তার পীর তাকে ঢাকায় আবদ্ধ (স্থায়ী) হয়ে থাকা, বিয়ে করা, আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখা এবং লঙ্গরখানা পরিচালনার চারটি শর্ত দিয়েছিলেন। তিনি ১২১৪ হিজরির ১ শাবান ইন্তেকাল করেন এবং তার মাজার আজও দায়রা শরিফের গম্বুজওয়ালা রওজার অভ্যন্তরে অবস্থিত। (কিংবদন্তির ঢাকা, পৃষ্ঠা : ৪৮২-৪৯০)

মওলানা শাহ আবদুর রহীম শহীদ

মওলানা শাহ আবদুর রহীম শহীদ ১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে কাশ্মীরে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মীয় জ্ঞানের বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জনের পর সতেরো শতকের শেষের দিকে বাংলাদেশে আসেন। বিশ বছর একাধারে ইবাদতে মশগুল থাকার পর তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান এবং ফিরে এসে ঢাকার লক্ষ্মীবাজার মহল্লায় খানকাহ স্থাপন করে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১১৫৮ হিজরির ৭ শাবান (১৭৪৫ খ্রি.) এক উন্মাদ ব্যক্তি তার দেহে সাতটি তরবারির আঘাত করে। এই আঘাতের প্রায় এক মাস তিন দিন পর তিনি শাহাদতবরণ করেন। লক্ষ্মীবাজার মহল্লার মিয়া সাহেবের ময়দানে তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে তার মাজার সেখানেই অবস্থিত। (বাংলাদেশে ইসলাম, পৃষ্ঠা : ১৮১)

হজরত খাজা শরফুদ্দিন (খাজা চিশতী বেহেশতি)

ঢাকা সুপ্রিম কোর্ট ভবনের পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে আছে হজরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতী বেহেশতির মাজার। এটি ঢাকার অন্যতম পুরোনো ও পরিচিত একটি দরগাহ। তিনি ছিলেন চিশতিয়া তরিকার অনুসারী একজন সুফি। মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে (১৫৫৬-০৫ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আগমন করেন এবং এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে ইসলামের বাণী প্রচার করেন। তার বংশপরিচয় নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে অনেকের ধারণা—তিনি ইসলাম খান চিশতীর বংশধর বা উত্তরপুরুষ ছিলেন। হিজরি ৯৯৮ সনেÑঅর্থাৎ ১৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন বলে জানা যায়। (বাংলাদেশে ইসলাম, পৃষ্ঠা : ১৭৭; বাংলাদেশের সুফি সাধক, পৃষ্ঠা : ১৮৭)

হজরত শাহজালাল দক্ষিণী

ভারতের গুজরাটের অধিবাসী শাহজালাল দক্ষিণী গৌড়ের স্বাধীন সুলতানদের আমলে বহু শিষ্য-শাগরিদসহ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আসেন। ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ইসলাম প্রচার করেন। ‘আখবারুল আখইয়ার’ গ্রন্থের মতে, তিনি প্রখ্যাত সুফি শায়খ সলিম চিশতীর বাঙালি শাগরিদ শায়খ পিয়ারার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

কিছুকাল পরে তার প্রভাব-প্রতিপত্তির বৃদ্ধি দেখে তৎকালীন সুলতান আতঙ্কিত হয়ে তার বিরুদ্ধে সেনাদল পাঠান। সৈন্যদের আক্রমণে তিনি ও তার সব শাগরিদ নিহত হন। কোনো কোনো গ্রন্থ মতে এ ঘটনা ১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ঘটেছে, তখন গৌড়ের সিংহাসনে ছিলেন সুলতান রুকনুদ্দীন বরবক শাহ। যদিও তিনি ইসলামপ্রিয় শাসক ছিলেন, তবে ধারণা করা হয়—কারো প্ররোচনায় পড়ে যথার্থ তদন্ত না করে তিনি এই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। ঢাকার বঙ্গভবন এলাকায় তিনি তার শাগরিদদের সঙ্গে সমাহিত আছেন। (বাংলাদেশে ইসলাম, পৃষ্ঠা : ১৬৮)

হজরত শাহ আলী বাগদাদী

হজরত শাহ আলী বাগদাদী ঢাকার মিরপুর এলাকায় অনন্ত নিদ্রায় শায়িত আছেন। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ তার মাজার জিয়ারত করতে আসেন। বংশধরদের কাছে সংরক্ষিত কুরসিনামা থেকে জানা যায়, ৮৩৮ হিজরিতে (১৪১২ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি একশজন সুফি ও দরবেশকে সঙ্গে নিয়ে বাগদাদ থেকে দিল্লিতে আসেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। পিতা শাহ ফখরুদ্দীনের মৃত্যুর পর বড় ভাই দায়িত্ব গ্রহণ করলে, মাত্র বিশ বছর বয়সে শাহ আলী এদেশের দিকে যাত্রা করেন। তার বংশলতিকা হজরত আলী (রা.) পর্যন্ত গিয়ে মেলে। পারিবারিক কুরসিনামা অনুসারে, ৯২৩ হিজরিতে (১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি ইন্তেকাল করেন। (বাংলাদেশের সুফি-সাধক, পৃষ্ঠা : ১৯৫)

হজরত শাহ আহসানউল্লাহ

শাহ আহসানুল্লাহ ছিলেন একজন খ্যাতিমান সুফিসাধক ও ইসলাম প্রচারক। তার জন্ম বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজারে। তিনি বিভিন্ন আলেমের কাছে আরবি, ফারসি, হাদিস ও তাফসির শিক্ষা লাভ করেন। শাহ পীর মোহাম্মদের কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষা নেন। তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সরকারি দমন-পীড়নের সময় নরসিংদীতে আত্মগোপন করেন। পরে মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরীর সান্নিধ্যে আসেন এবং সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।

হজরত শাহ আহসানউল্লাহর মাজার নারিন্দার পূর্বভাগে অবস্থিত। ১৩৩৩ সনের ১১ কার্তিক (১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ অক্টোবর) ইন্তেকাল করেন। (বাংলাদেশের সুফি-সাধক, পৃষ্ঠা : ১৯৮)

হজরত শাহ মালেক ইয়ামেনি (পীর ইয়েমেনি)

পীর ইয়েমেনির প্রকৃত নাম শায়খ মালেক এবং তিনি চতুর্দশ শতাব্দীর একজন দরবেশ ছিলেন। তিনি ইয়েমেন থেকে দিল্লি হয়ে বাংলায় আসেন এবং নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানকায় শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সিলেট বিজয়ে অংশ নেন। শাহজালাল তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। যেখানে তিনি একটি খানকাহ স্থাপন করেন। কঠোর সাধনার ফলে ‘পীর’ বা ‘আল্লাহর ওলি’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ঢাকার ওসমানী উদ্যানের উত্তর-পূর্ব পাশে তার মাজার রয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য মতে তিনি ৯১৫ হিজরির কোনো এক দিনে মৃত্যুবরণ করেন।

শাহ নিয়ামতুল্লাহ বুতশিকন

পূর্ববঙ্গে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক আগে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। ঢাকা নগরীতে ইসলাম প্রচার করতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দুরা নানাভাবে তাকে বাধা দিতে থাকে। একদিন শোরগোল সৃষ্টি করে তার ইবাদতে বিঘ্ন ঘটালে তার ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে মূর্তিগুলোর প্রতি আঙুল নির্দেশ করলে পথের উপরেই মূর্তিগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তাই তাকে ‘বুতশিকন’ বলা হয়।

বর্তমান ঢাকা নগরীর পুরানা পল্টন এলাকায় দিলকুশা বাগে শাহ নিয়ামতুল্লাহর মাজার অবস্থিত। মাজারের পাশে পাঠান আমলে নির্মিত একটি প্রাচীন মসজিদও বিদ্যমান রয়েছে।

যেভাবে পলাশী আসে

বাংলাদেশের ইতিহাস ক্যালেন্ডার

বিএমইউর রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম

ডেঙ্গুতে ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ২৫১

বাকপ্রতিবন্ধকতার লক্ষণ

ডেঙ্গু যখন ছদ্মবেশী ঘাতক

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিংয়ে ভোজ্যতেল বাজারজাতের আহ্বান

ভুটানে বাংলাদেশের নয়নাভিরাম দূতাবাস

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আহছানিয়া মিশনে অ্যাডভোকেসি সভা

সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা হবে বিনা খরচে