‘চাকা’ সভ্যতার অগ্রগতিতে বিশাল পরিবর্তন এনে পৃথিবীর চেহারা বদলে দিয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় মৃৎশিল্পের হাতিয়ার হিসেবে চাকার ব্যবহার শুরু হয়। এরপর চাকা পরিবহন ও যান্ত্রিক ব্যবস্থায় অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
চাকা আবিষ্কারের ইতিহাস
সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে প্রস্তর যুগে মানুষ ভারী ভারী পাথর দিয়ে অনেক স্থাপনা নির্মাণ করতে শুরু করে। কিন্তু ভারী পাথর একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়া কষ্টকর ছিল। ফলে মানুষ ভেবে চলে—কীভাবে কম পরিশ্রমে ভারী বস্তু অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে সেই সমস্যা সমাধানে মানুষ সমতল কাঠের তল ব্যবহার করে মালামাল পরিবহন করতে শুরু করে। কিন্তু এতেও মালামাল স্থানান্তরে অনেক কষ্ট হতো। সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মানুষ সিলিন্ডার আকৃতির কাঠের গুঁড়ির ধারণা নিয়ে আসে এবং তা ধীরে ধীরে মানবসভ্যতাকে কাঠের চাকা ব্যবহার করার দিকে নিয়ে যায়। তবে সমস্যার শেষ হয় না, কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে কাঠ ক্ষয় হয়ে চাকায় ফাটল ধরে ভেঙেও যেত। প্রাচীন চীন ও তুর্কির মতো যেসব এলাকায় কাঠের সংকট ছিল, সেখানে কাঠের পরিবর্তে পাথরের চাকা ব্যবহার করা হতো। পাথরের চাকা অনেক ভারী হলেও বেশ টেকসই ছিল।
গ্রিসের নতুন চাকা
নিরেট কাঠের চাকা ব্যবহারের যুগ শেষ হওয়ার পর প্রাচীন গ্রিসে এক নতুন ধরনের উন্নত চাকা আবিষ্কৃত হয়। এই চাকাগুলো ছিল ইংরেজি ‘H’ অক্ষরের মতো। অতিরিক্ত ভারের কারণে যেন ভেঙে না যায়, সেজন্য এসব চাকায় একাধিক তক্তা ব্যবহার করা হতো। আগের চাকার তুলনায় এগুলো টেকসই ও ভার বহনে বেশি কার্যকর হওয়ায় দীর্ঘ সময় এসব চাকার তেমন পরিবর্তন হয়নি।
খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সাল নাগাদ ইউরোপ, ভারত ও চীনে বিভিন্ন ধরনের চাকার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। তারা চাকার মধ্যে স্পোকের ব্যবহার শুরু করে। ফলে চাকা যেমন অনেক হালকা হয়, তেমনি গতিও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তখনো চাকা ক্ষয়ের সমস্যা থেকেই যায়। তারও প্রায় এক হাজার বছর পর ব্রোঞ্জ আবিষ্কৃত হলে চাকার চারপাশে ধাতব আবরণ দেওয়া শুরু হয়। এর ফলে চাকার স্থায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়।
আধুনিক চাকা
১৮ শতকের শুরুর দিকে চাকায় বিয়ারিং ও ধাতব এক্সেলের ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলে গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। ১৮৪৪ সালে চার্লস গুডইয়ার চাকার অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে ভলকানাইজড রাবার ব্যবহার করেন। এই নতুন চাকাগুলো মসৃণভাবে চলাচলের পাশাপাশি শক্তিশালী গ্রিপও প্রদান করে।
১৮৮৮ সালে আয়ারল্যান্ডে John Boyd Dunlop নিউমেটিক টায়ার আবিষ্কার করেন, যার ফলে চলাচল আরো আরামদায়ক হয় এবং একই সঙ্গে চাকার স্থায়িত্বও অনেক বৃদ্ধি পায়। ডানলপের চাকাতেই প্রথম পুরু রাবারের শক্ত স্তরের পরিবর্তে বাতাস দিয়ে ভরা টিউব ব্যবহার করা হয়, যা রাস্তার উঁচু-নিচু ঝাঁকুনি অনেক ভালো শোষণ করতে পারে।