খেলতে যাওয়ার জন্য সৃজন যেইমাত্র উঠোনে নেমেছে, অমনি মা এসে বললেন, ‘আজ আর খেলতে যাস না। আজ তোকে নিয়ে আমি কিছু কাজ করবে।’
‘আমাকে নিয়ে কাজ করবে? কী কাজ, মা?’ কৌতূহল নিয়ে সৃজন জিজ্ঞেস করল।
মা বললেন, ‘তোর দাদু গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর তার ঘর পরিষ্কার করা হয়নি। ধুলোবালি পড়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে আছে। চল্, দুজনে মিলে পরিষ্কার করে দিই।’
দুই.
মা মাকড়সার জাল পরিষ্কার করছেন, আর সৃজন টুলের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে রাখা বইপত্র ঝেড়ে-মুছে সাজিয়ে রাখছে। সে সময় হাত থেকে একটি বই পড়ে গেলে সৃজন বলল, ‘সরি মা, বইটা পড়ে গেল। আমি তুলে রাখছি।
বইটি হাতে নিয়ে দেখার সময় সৃজন বইয়ের ভেতর একটি চিঠি পেল ৫০ বছর আগে দাদুর কাছে লেখা বাবার চিঠি। বাবা তার মায়ের কাছে কী লিখেছিলেন, তা জানার জন্য সৃজন চিঠিটি খুলল। সৃজন দেখতে পেল বাবা লিখেছেন—
২৩.০২.১৯৫২
গেন্ডারিয়া, ঢাকা
মা,
সালাম নেবে। আশা করি ভালো আছ। আল্লাহর রহমতে আমি ভালো আছি। আমাদের গ্রামে খবরের কাগজ যায় না। বাড়িতে রেডিও নেই। তাই জানি না ঢাকার খবর জান কি না। গত পরশু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি নিয়ে আমরা যে মিছিল করেছিলাম, পুলিশ তার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। তাতে বহু ছাত্র-জনতা শহীদ হয়েছেন। অনেকে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
গত বছর যখন বাড়িতে এসেছিলাম, তখন জানতে চেয়েছিলে পাকিস্তান হওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় আমরা ওদের ওপর খেপে উঠেছি কেন? কারণটা সেদিন বলা হয়নি, আজ বলছি। প্রথমেই জেনে রাখো মা, ওদের ওপর খেপে ওঠার পেছনে অনেক কারণ আছে। তুমি তো জানো, পূর্ব পাকিস্তানে আমরা রয়েছি ছয় কোটি বাঙালি। তার মানে, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ ভাগ। অথচ ৪৩ ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে ওরা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে! কায়দে আযম বলেছেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এটা তাদের অন্যায় দাবি। এ কারণেই আমরা বলেছি, জীবন থাকতে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেব না। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাঙালিদের অবস্থান ওপরে। বাংলা একটি সমৃদ্ধ ভাষা। তাই উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে।
আমাদের দাবি যে অযৌক্তিক নয়, আমরা তা সরকারকে বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকারের মাথার ওপর যেসব অবাঙালি কর্মকর্তা রয়েছেন, তারা কিছুতেই বাংলা ভাষাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে রাজি নন। শুনে অবাক হবে, নূরুল আমিন আর নাজিমুদ্দীনের মতো বাঙালি নেতারাও ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার সম্মান দিতে চাইছেন! শুধু তা-ই নয় মা, ওরা বাংলা বাক্যকে উর্দু হরফে লেখার জন্য আমাদের বাধ্য করতে চাইছে। এমন অন্যায় কী মেনে নেওয়া যায়? মেনে নেওয়া যায় না বলেই গত একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে আমরা মিছিল বের করেছি। ওটা ছিল শান্তিপূর্ণ মিছিল। কিন্তু সরকারের পুলিশ বাহিনী শান্তি বজায় রাখতে দেয়নি। ওরা নির্দয়ভাবে গুলি চালিয়েছে। তাতে অনেকে শহীদ হয়েছেন। অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়েছে।
আফজাল আমার রুমমেট। আমরা একসঙ্গে চলাফেরা করি। মিছিলেও আফজাল আমার পাশে ছিল। কিন্তু গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর নিজ নিজ জীবন নিয়ে আমরা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ি। সে সময় আফজাল আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তারপর থেকে ওকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। জানি না আফজালও ভাষা শহীদদের একজন হয়ে গেছে কি না। দোয়া করবে মা, আফজালকে যেন ফিরে পাই।
ঢাকার অবস্থা বলে বোঝাতে পারব না। আন্দোলনরত ছাত্রদের খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ বাড়ি বাড়ি ঢুকে তল্লাশি চালাচ্ছে। হাতের সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই আন্দোলনকারী বলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তাই হল ছেড়ে পুরোনো ঢাকায় এক বন্ধুর বাসায় এসে উঠেছি। পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকব।
বুঝতে পারছি, এ চিঠি লিখে তোমাকে চিন্তায় ফেলে দিচ্ছি। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। সবার ওপর আল্লাহ আছেন। তিনি আমাকে ভালোই রেখেছেন। সবসময় যেন ভালো থাকতে পারি, সে দোয়া কোরো। তুমি নিজের যত্ন নিও।
তোমার আদরের
তন্ময়
তিন.
চিঠি পড়া শেষ হতেই সৃজন দেখল মা অসীম কৌতূহল নিয়ে চিঠিটির দিকে তাকিয়ে আছেন। সৃজন পেছনে ঘুরতেই মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী পড়ছিস? ওটা কী?’
সৃজন বলল, ‘দাদুর কাছে লেখা বাবার চিঠি। বাবাও যে বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন, কোনোদিন সে কথা শুনিনি! আজ এ চিঠি পড়ে তা জানতে পারলাম। বাবা কখনো সে কথা বলেননি কেন, মা?’
মা বললেন, ‘নিজ থেকে তিনি আমাকেও বলেননি। আমি তোর দাদা-দাদুর কাছে শুনেছি।’
‘তোমাকেও বলেননি! কেন মা, বলেননি কেন?’ সদ্য পড়া চিঠিটার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে সৃজন প্রশ্ন করল।
মা ভাবলেন এক মুহূর্ত। তারপর বললেন, ‘কেন যে নিজমুখে ওসব কথা কাউকে বলেননি, তা তো জানি না। সম্ভবত দেশের জন্য কিছু করে সে কথাকে জনে জনে বলে বেড়ানোটাকে তিনি অসম্মানজনক মনে করতেন, তাই কাউকে বলেননি।’
চিঠিটাকে ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে সৃজন বলল, ‘বাবার জন্য সবসময় আমার শ্রদ্ধা ছিল। আজ থেকে সেইসঙ্গে যোগ হলো অহংকার। আমার বাবাও বাহান্নর মিছিলে ছিলেন, বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেনÑসেই পবিত্র অহংকার।’