ঝোপঝাড়ের এক কোণে একটা পুরোনো ইটের ঢিবির কাছে থাকে ধবধবে সাদা একটা বেড়াল। ওর নাম টিকলু। টিকলুর মনে খুব দুঃখ। কারণ তার গায়ের রঙ ম্যাড়ম্যাড়ে।
টিকলু প্রজাপতির আগুনরঙা ডানা আর ফড়িংয়ের ঝলমলে শরীর দেখে আর ভাবে, ইশ! আমারও যদি অমন ঝলমলে রঙ থাকত। দুঃখ ঘোচাতে সে ঝোপের ফুল-পাতা দিয়ে নিজেকে সাজাতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে ওকে আরো ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে।
ঝোপের সবচেয়ে বয়স্ক প্রাণী হলেন ধীরু দাদু, এক বয়স্ক কচ্ছপ। তিনি টিকলুকে দেখলেই একটু হেসে বলেন, ‘আরে বোকা, সাদা রঙ তো তোর বিলাসিতা। তোর মতো এমন ধবধবে সাদা বেড়াল এলাকায় আর কটা আছে, বল?’
কিন্তু টিকলুর মন মানে না। সে চায় রঙিন হতে।
একদিন দুপুরে এক বাচ্চা মেয়ে ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে ললিপপ খাচ্ছিল। ললিপপটা দেখতে ঠিক যেন রঙধনুর টুকরো আর সেটার ভেতর থেকে স্ট্রবেরি, লেবু আর কমলার মিষ্টি সুগন্ধ বেরোচ্ছিল। হঠাৎ মেয়েটার মা তাকে ডাক দিতেই সে তাড়াহুড়ো করে ললিপপটা ঘাসের উপর ফেলে দৌড় দিল।
টিকলু দূর থেকে সব দেখেছে। এমন সুন্দর জিনিস সে জীবনেও দেখেনি। সে ঢিবি থেকে বেরিয়ে এসে সাবধানে ললিপপটার কাছে গেল। কী মিষ্টি গন্ধ! লোভ সামলাতে না পেরে সে ললিপপটায় আলতো করে একবার জিভ ছোঁয়ালো। আর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটল এক অবাক কাণ্ড! টিকলুর ম্যাড়ম্যাড়ে গায়ের রঙ বদলে টকটকে লাল হয়ে গেল।
টিকলু তো খুশিতে প্রায় অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়। সে দৌড়ে একদল পিঁপড়ের সামনে গিয়ে লেজ উঁচিয়ে বলল, ‘দেখেছিস, আমি এখন কেমন সুন্দর আগুন-রঙা লাল টুকটুকে।’
পিঁপড়েরা অবাক হয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগল, কেউ কেউ ভয়ে লাইন ভেঙে দৌড় দিল।
টিকলুর সাহস বেড়ে গেল। সে আবার গিয়ে ললিপপটায় আরেকটা চাট দিল। এবার তার রঙ হয়ে গেল ঝকঝকে নীল।
সে খুশিতে লাফাতে লাফাতে একটা ঘাসফড়িংয়ের সামনে গিয়ে নীল রঙের অহংকারে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হে, কেমন লাগছে আমায়?’
নীল রঙের বেড়াল দেখে ঘাসফড়িংটা ভয়ে এমন লাফ দিল যে সোজা গিয়ে পড়ল এক মাকড়সার জালে। মাকড়সা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আরে বাবা, নীল বেড়াল দেখেছো—ভালো কথা। তাই বলে এমন কাণ্ড করবে?’
ধীরু দাদু দূর থেকে সবকিছু দেখে মাথা নেড়ে বললেন, ‘টিকলু, থাম। অতিরিক্ত কিছুই ভালো না।’
কে শোনে কার কথা। টিকলুর মাথায় তখন নতুন বুদ্ধি এসেছে। সে ঠিক করল, এলাকার সব পশুপাখিকে ডেকে এনে তার রঙের খেলা দেখাবে। সবাইকে সে এক জায়গায় জড়ো করল। প্রজাপতি, মৌমাছি, ফড়িং, পিঁপড়ে—সবাই এসেছে টিকলুর কাণ্ড দেখতে।
টিকলু সবার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা করল, ‘বন্ধুগণ, এখন আমি তোমাদের এমন এক রঙ দেখাব যা তোমরা জীবনেও দেখোনি। এই রঙ দেখে তোমরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেও আমি অবাক হব না।’
এই বলে সে জাদুর ললিপপটায় দিল মস্ত বড় এক চাট। সে ভেবেছিল এবার হয়তো সোনালি রঙ হবে। কিন্তু হলো আরেক কাণ্ড।
অতিরিক্ত চাটার ফলে ললিপপের জাদু গুলিয়ে গেল। টিকলুর রঙ একবার হতে লাগল ফুটফুটে লাল, পরক্ষণেই চমকদার নীল, তার পরের সেকেন্ডেই জ্বলজ্বলে সবুজ, তারপর আলো ঝলমলে হলুদ। সে যেন একটা জীবন্ত ডিস্কো লাইট হয়ে গেল।
টিকলুর শরীরটা লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-বেগুনি রঙে একবার জ্বলছে, একবার নিভছে, আর ঝাপসা চোখে সে মনে করছে সবাই হাততালি দিচ্ছে। রঙের ঝলকানিতে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। টলতে টলতে সে ঠিক ঘাসফড়িংয়ের মতো মস্ত এক লাফ দিয়ে ধপাস করে গিয়ে পড়ল পাশের কাদাভর্তি ছোট্ট ডোবাটার মধ্যে আর তার হাত থেকে জাদুর ললিপপটাও ছিটকে গিয়ে কাদায় ডুবে গেল।
খানিকক্ষণ পর টিকলু যখন কাদা থেকে মাথা তুলল, তখন তার গায়ে কোনো রঙই নেই। সে তখন আপাদমস্তক কাদায় মাখা একটা অদ্ভুত, বিস্কুটের মতো বাদামি রঙের বস্তু।
সেই দৃশ্য দেখে সবাই হাসতে হাসতে শেষ। ধীরু দাদু তখন হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে টিকলুর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘কি? এবার খুশি তো?’
টিকলু বোকার মতো মুখ করে হাসল। রঙিন হওয়ার শখ তার পুরোপুরি মিটে গেছে। সেদিন থেকে সবাই তাকে ‘কাদামাখা টিকলু’ বলে ডাকে। আর সেই নাম শুনলেই টিকলু লেজ গুটিয়ে লজ্জায় তার ঢিবির ভেতর লুকিয়ে থাকে।