হোম > ফিচার > স্বাস্থ্য

সিজোফ্রেনিয়া মস্তিষ্কের জটিল রোগ

ডা. বুলবুল আহমেদ খান

আজ আমরা সিজোফ্রেনিয়া রোগ নিয়ে আলোচনা করব। সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক রোগ, যা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন এ রোগ নিরাময়ের যোগ্য নয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তবে চিকিৎসা নিলে আক্রান্ত রোগীও স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে এবং সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া মস্তিষ্কের একটি জটিল রোগ, যা রোগীর চিন্তা, আচরণ ও অনুভূতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কথা বলার ধরন, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা এবং বাস্তবতা অনুধাবন ক্ষমতা ব্যাহত করে। জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। অনেকের ক্ষেত্রে শীতকালে এ রোগের প্রকোপ বাড়ে, আবার কারো ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই রোগের লক্ষণের কিছু পার্থক্য থাকে। তবে প্রধান লক্ষণগুলো মোটামুটি একই রকম। চিকিৎসা শুরু করা একজন রোগীর কেস হিস্ট্রি সম্মানিত পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করা হলো। চিকিৎসা শুরু করার রোগের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সঠিক চিকিৎসা পেলে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

উচ্চ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের এক মেয়ে বিয়ের পর থেকে অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করেন। দেখা গেল তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্য সদস্যের সিদ্ধান্ত মিলছে না। নিজের স্বর্ণের গহনা বিক্রি করে বাচ্চাদের জুতা কিনে দিচ্ছেন এবং বাকি টাকা মানুষকে দিয়ে দিচ্ছেন। ঘর-সংসারের চেয়ে বহুমুখী জীবনে তার আগ্রহ বেশি। রিকশা নিয়ে সারাদিন ঘুরতেন। রিকশা ভাড়া দেওয়ার জন্য ঘরের চাল বিক্রি করে দিতেন। নিজের জীবনযাপনের সিদ্ধান্তকে ঠিক মনে করতেন। অন্যদের মতামত ও উপদেশকে পাত্তা দিতেন না। আস্তে আস্তে সমস্যা বাড়তে লাগল। বাসায় পাওনাদাররা আসতে লাগল। তাদের উল্টোপাল্টা কথা বলতেন। তিনি ধার নিয়ে বিভিন্ন মানুষকে টাকা দিয়ে দিয়েছেন। সবাই বুঝতে পারল, তার কোনো সমস্যা আছে। ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিলেন। একটি সংস্থার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে যুক্ত হয়ে গেলেন। পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। ছেলেকে দেখতে পারতেন না, মেয়ের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্ক ছিল। তার করুণ অবস্থা দেখে মেয়ে এসে তার সঙ্গে থাকতে শুরু করল। একপর্যায়ে তিনি ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলেন। একসময় রোগী নিজের মেয়েকে ও মেয়ের জামাইকে সন্দেহ করা শুরু করেন। ঘরে দা-বঁটি নিয়ে এনে রাখতেন। একপর্যায়ে তার মেয়ের জামাইকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। এ পর্যায়ে এসে চিকিৎসা শুরু হয় ওই নারীর। আস্তে আস্তে উন্নতি হওয়া শুরু করে। নিজের মেয়েকে ঘরে ঢুকতে দেন, তবে ওষুধ সরিয়ে ফেলেন। তাকে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো সম্ভব হয়। রোগের লক্ষণের উন্নতি হওয়ার ফলে কয়েক বছর পর ছেলের কাছে থাকতে শুরু করলেন। পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেননি, এটি একটি রোগ, চিকিৎসা করলে ঠিক হয়। মানুষের যেমন সর্দিকাশি হয়, এটাও ব্রেনের একটি অসুখ। এই অসুখ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব। তিনি নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে আসতেন। ছেলে নিয়মিত ওষুধ খাওয়াতেন। রোগী প্রায় বলতেন, আগে আমি অনেক ভুল করেছি। আমার আরো আগে চিকিৎসা নেওয়া দরকার ছিল। আস্তে আস্তে চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

রোগীর মা ও বোনেরও মানসিক সমস্যা ছিল। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের মাঝে এমন সমস্যা দেখা দিলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নিতে হয়। এ রোগে একা একা কথা বলা, গায়েবি আওয়াজ শোনা, অসংলগ্ন আচরণ করা, আবোল-তাবোল কথা বলা এবং অহেতুক সন্দেহ করার ঘটনা ঘটে। রোগী মনে করে, ‘মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে, আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, আমার ভেতর কোনো যন্ত্র ঢুকিয়ে দিচ্ছে।’ তার মনে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগীর কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস থাকতে পারে, যা বাস্তব নয়।

সমাজে ধারণা আছে, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর বিয়ে দিয়ে দিলে ভালো হয়। বিয়ে দিলে সিজোফ্রেনিয়া সারে না। আর সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে বিয়ে দেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। রোগী অলৌকিক কিছু দেখে তা একসময় বাস্তব মনে করতে শুরু করে এবং রোগের অবস্থা ও বাস্তবতা আলাদা করতে পারে না। অনেক সময় তার মনে হয়, নিজের অথবা অন্যের ক্ষতি করার নির্দেশ আসছে। এটা কখনো কখনো অনেক বিপজ্জনক হতে পারে। প্রসূতিদের অনেকের গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের পরে বিষণ্ণতা দেখা দেয়। কিন্তু কোনো কোনো মায়ের মধ্যে নিজের ও অন্যদের বাচ্চার ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা যায়। তখন মা ও বাচ্চার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে বাচ্চাকে আলাদা রাখতে হয়।

সিজোফ্রেনিয়া রোগে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড প্রভৃতি রোগের মতো সারাজীবনের জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগের চিকিৎসা না করলে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

লেখক : রেজিস্ট্রার, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ

গর্ভবতী নারীরা নিরাপদে রোজা রাখবেন যেভাবে

ইফতারের পর ক্লান্তি দূর করতে যা করবেন

‘মানুষকে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে হবে না, ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবে’

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?

রোজায় নাক-কান গলার চিকিৎসা

খাদ্য ওষুধের কাজ করে?

বসন্তে ছড়িয়ে পড়া রোগ

বিষণ্ণতায় ওষুধের চেয়েও কার্যকর হতে পারে নাচ

আয়ুর্বেদিকের কোন ওষুধ ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়

জেনে নিন পিঠের ব্যথা এড়ানোর সঠিক উপায়