আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য কেমন হবে, তা হঠাৎ কোনো ঘটনার মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস দ্বারাই নির্ধারিত হয়। সকালের শুরুটা কীভাবে তা থেকে শুরু করে মানসিক চাপের মুখে আমরা প্রতি মুহূর্তে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি—এর সবকিছুই আমাদের মন, কর্মক্ষমতা এবং মানসিক শক্তির ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এমন আটটি সহজ অভ্যাস সম্পর্কে জানা যাক—
১. পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম
পর্যাপ্ত ও পরিমিত ঘুম শুধু শরীরের জন্য নয়, মনের জন্যও অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের অভাব মানুষকে খিটখিটে, রাগান্বিত, উদ্বিগ্ন, অসুখী এবং অতিরিক্ত চিন্তিত করে তোলে। ভালো ঘুমের জন্য করণীয়—
* প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটি নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখুন।
* বিকাল ৩টার পর চা বা কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
* ঘুমানোর ঘরটি শান্ত, নিরিবিলি, পরিচ্ছন্ন এবং কিছুটা ঠান্ডা (১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখার চেষ্টা করুন।
২. সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমানো
সারাক্ষণ ভার্চুয়াল জগতে অন্যের জীবনের চাকচিক্য দেখলে নিজের সঙ্গে তুলনা করার একটি নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। এটি পরোক্ষভাবে মন খারাপ, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা, হতাশা বাড়ায়। করণীয়—
* বিছানায় যাওয়ার সময় ফোনটি দূরে বা অন্য কোনো ঘরে রেখে দিন।
* পরিবার, বই, সৃজনশীল কাজ বা বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোর প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া।
* প্রয়োজনে অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন বা কিছুদিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ আনইনস্টল করে দিন।
৩. পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করুন
মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। মানুষ একাকী বাস করতে পারে না। ভালো বন্ধু বা আপনজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ একাকিত্ব দূর করতে এবং কঠিন সময়ে মনে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। করণীয়—
* বন্ধুদের খোঁজ নিতে একটি ছোট মেসেজ পাঠান বা কোনো মজার কিছু শেয়ার করুন।
* কাজের ফাঁকে দুপুরের বিরতিতে প্রিয় মানুষের সঙ্গে ছোট একটা ফোন কলে কথা বলুন।
* সপ্তাহে বা মাসে অন্তত এক-দুবার একসঙ্গে বসে চা খাওয়া বা আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা করুন।
৪. নিয়মিত শরীরচর্চা করা
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম শরীরে ‘ফিল-গুড’ হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এজন্য জিমে গিয়ে ভারী ব্যায়াম করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। করণীয়—
* প্রতিদিন কিছুক্ষণ হাঁটুন বা হালকা যোগব্যায়াম করুন।
* লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
* ডেস্ক জবের ক্ষেত্রে কাজের ফাঁকে প্রতি ঘণ্টায় একটু হাত-পা ছড়িয়ে স্ট্রেচিং বা শরীর টানটান করে নিন। এটি রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং পেশিকে শিথিল করে
* কয়েকবার গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিন
৫. পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ
আমরা যা খাই, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিষ্কে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মেজাজ ভালো রাখার মতো পুষ্টিকর উপাদান রাখুন। করণীয়—
* বেরিজাতীয় ফল, কলা, শিম, লাল চালের ভাত এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ তৈলাক্ত মাছ (যেমন সামুদ্রিক মাছ) ডায়েটে রাখুন।
* সারাদিনে প্রচুর পানি পান করুন। শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন হলে মস্তিষ্ক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
* অতিরিক্ত ক্যাফেইন, অ্যালকোহল, ভাজা-পোড়া ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়, তাই নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম শরীরে ‘ফিল-গুড’ হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
৬. খারাপ দিনে নিজেকে সময় দিন
সব দিন সবসময় সমান যায় না। কোনো দিন যদি খুব খারাপ লাগে বা কোনো কাজ করতে ইচ্ছা না করে, তবে জোর করে কিছু করার দরকার নেই। করণীয়—
* নিজেকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার বা ঘরে থাকার অনুমতি দিন।
* একটি লম্বা সময় ধরে গরম পানিতে গোসল করতে পারেন বা বুক ভরে কয়েকবার গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারেন।
* বড় কোনো কাজ না করে যেকোনো একটি অতি ক্ষুদ্র কাজ সম্পন্ন করুন—যেমন শুধু বিছানাটা গুছিয়ে নেওয়া বা এক গ্লাস পানি খাওয়া। এই ছোট অর্জনও মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৭. মেডিটেশন বা ধ্যানের অভ্যাস
মন শান্ত করতে ‘যোগব্যায়াম নিদ্রা’ বা যেকোনো সাধারণ ধ্যানের সাহায্য নিতে পারেন। চিত হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং ভাবুন একটি শান্ত ঢেউ আপনার পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত এবং মাথা থেকে আবার পায়ে ফিরে যাচ্ছে। এটি ১০-৩০ মিনিট করতে পারেন। সময় কম থাকলে স্রেফ বুকের ওপর হাত রেখে ২ সেকেন্ড শ্বাস নিয়ে ৪ সেকেন্ড ধরে ছাড়ুন।
৮. গায়ে সূর্যের আলো লাগান
সূর্যের আলো ভিটামিন ‘ডি’-এর একটি বড় উৎস, যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন মাত্র ৫ মিনিট খোলা আকাশের নিচে বা বারান্দায় বসলে মন ও হৃদয়ে একধরনের সতেজতা আসে। সম্ভব হলে অফিসের জানালাটি খুলে রাখুন বা দুপুরের খাবার পর কোনো পার্কে ঘুরে আসুন। এই জীবনশৈলীগুলো আপনার মন ভালো রাখতে সাহায্য করবে। ঠিকই, তবে এগুলো কোনো মানসিক রোগের বিকল্প চিকিৎসা নয়। যদি নিচের লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।
* কোনো বড় মানসিক আঘাত, দুর্ঘটনা বা প্রিয়জন হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না পারলে।
* কোনো কারণ ছাড়াই সবসময় অতিরিক্ত মন খারাপ, ভয় বা রাগ অনুভব করলে।
* জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম ও চাকরিতে মনোযোগ বা উৎসাহ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেললে।
* ক্ষুধা ও ঘুমের রুটিনে বড় ধরনের অনিয়ম দেখা দিলে।
* নিজেকে সামলাতে না পেরে মাদক বা ক্ষতিকারক কোনো অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে।
তথ্যসূত্র : হেলথলাইন
শিক্ষার্থী, ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস