জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ কত পেশাকেই বেছে নেয়। কেউবা আবার মানবসেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে, এমন পেশাকেই রাখে পছন্দের তালিকায়। তেমনই একজন রেনুয়ারা বেগম। মানুষের সেবা করবেন—এই ভাবনা থেকেই তিনি বেছে নেন নার্সিং পেশা। নার্সিং জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন। রেনুয়ারার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। নিজ জেলা জয়পুরহাটে এইচএসসি পাস করার পর নার্সিংয়ের জন্য অ্যাডমিশন টেস্ট দেন। ভাগ্যক্রমে টিকেও যান। রেনুয়ারা বলেন, ‘এরপর ঢাকা চলে আসি। ঢাকা মেডিকেলের এনটিসি থেকে ডিপ্লোমা ও মিডওয়াইফারি কোর্স কমপ্লিট করি। তখন খুঁজতে থাকি চাকরি। আমার প্রথম চাকরি হয় মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তবে সেখানে বেশিদিন থাকা হয়নি। পিজি হসপিটালে দীর্ঘ ২৬ বছর কাজ করি। ২০১৫ সাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে কাজ করছি। নার্সিং সুপারভাইজার হিসেবে এখনো ওখানেই আছি।’
নার্সিং পেশা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার নার্সিং পেশা ভালো লাগত। একটা রোগীর পাশে থাকব, তাকে সেবা দিয়ে সুস্থ করব—নিজের কাছে তখন আনন্দ লাগবে। এসব চিন্তা থেকেই এই পেশায় আসি।’
‘রোগীর সেবা দিতে গেলে নার্স ও রোগীর মধ্যে যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে একজন নার্সের কী গুণাবলি থাকা জরুরি?’ এমন প্রশ্নের জবাবে রেনুয়ারা বলেন, “রোগী যখন হাসপাতালে আসে, তখন রোগীকে রিসিভ করার পর প্রাথমিক কিছু আলোচনা সেরে নেওয়া জরুরি; যেমন—‘আপনার কী হয়েছিল? এখন কেমন লাগছে? আপনার এখন কী কী সমস্যা হচ্ছে? ইনশাআল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবেন, আমাদের সেবার ত্রুটি থাকবে না।’ রোগীর খোঁজখবর নেওয়ার এই গুণগুলো থাকা জরুরি।”
‘হাসপাতালগুলোয় গেলে দেখা যায়, রোগীদের নিয়ে নার্সদের ব্যস্ততার শেষ থাকে না। তাই নার্সদের যে চাপের মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ব্যস্ত সময়ে মানসিক চাপ কীভাবে সামাল দেন?’ এই প্রশ্নের উত্তরে অভিজ্ঞ এই নার্স বলেন, ‘আমি যখন খুব মানসিক চাপে থাকি, তখন নিজেকে কন্ট্রোল করে অনেক শান্ত হয়ে যাই। মাথায় তখন অন্য কিছু রাখি না, একেবারে কুল হয়ে যাই। সংসার, ফ্যামিলি—ওসব চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে ফেলি। যখন একটু চাপমুক্ত হই, তখন আবার স্বাভাবিক চিন্তা করি।’
‘অতীতের তুলনায় বর্তমানে নার্সিং পেশায় অনেক তরুণ-তরুণী আসছে। বেড়েছে নার্সিং কলেজের সংখ্যাও। নতুন নার্সদের মধ্যে কোন দিকগুলো উন্নতির প্রয়োজন বলে মনে করেন?’ জানতে চাইলে রেনুয়ারা বলেন, ‘রোগীর সঙ্গে কমিউনিকেশন এবং আচরণ ভালো করতে হবে। একটা নার্স এবং একটা রোগীর মধ্যে পারস্পরিক গুড রিলেশন থাকতে হবে। রোগীকে পরিবারের আপন সদস্য মনে করে সেবা দিতে হবে।’
‘যারা সাধারণত নার্সিং পেশায় সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসেন, তাদের অবশ্যই এই পেশায় প্রশান্তির একটা ব্যাপার থাকে। তাই নার্সিং পেশায় সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি কখন পান আপনি?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই তৃপ্তির জায়গা আছে। যখন একটা রোগীর খুব খারাপ অবস্থা থাকে, তখন আমরা নার্সরা সব ভুলে রোগীর সেবায় ব্যস্ত থাকি। আল্লাহর ইচ্ছায় এবং আমাদের চেষ্টায় মুমূর্ষু রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে মনে অনেক তৃপ্তি পাই। বিশেষ করে রোগী চলে যাওয়ার সময় যখন সেবা করার জন্য ভালো কিছু বলে, একটা ধন্যবাদ দেয়, তখন অনেক ভালো লাগে। ওই সময় মনে হয় আমি সঠিক পেশাটাই বেছে নিয়েছি।’
‘নার্সিং পেশার উন্নয়নে আপনি কী কী উন্নতি প্রত্যাশা করেন?’ জানতে চাইলে রেনুয়ারা বলেন, ‘বিগত দিনগুলোয় যারা নার্স ছিলেন তারা বর্তমানের মতো এত এডুকেটেড ছিলেন না। এখন যেহেতু এডুকেটেড অনেক নার্স আসছেন, নার্সিং কলেজের সংখ্যাও বেড়েছে, সেহেতু আমি হাসপাতালে আরো ভালো মানের সেবা দেওয়ার প্রত্যাশা করি।’