বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একসঙ্গে জন্ম নেওয়া পাঁচ প্রিম্যাচিউর (অপরিণত শিশু) ও স্বল্প ওজনের শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নবজাতকদের মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে তুলে দেন বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, নিওন্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নান, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তাবাছসুম পারভীন।
জানা গেছে, গত ৫ এপ্রিল বিএমইউর নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (এনআইসিইউ)-এ চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যায় ৩০ বছর বয়সী এক মায়ের গর্ভে ৩৩ সপ্তাহ বয়সে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে একসঙ্গে জন্ম নেওয়া পাঁচ প্রিম্যাচিউর ও স্বল্প ওজনের শিশু হয়। জন্ম নেয়া পাঁচ শিশু- দুই কন্যা ও তিন পুত্র। জন্মের পাঁচ দিন পর ৯ এপ্রিল পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের অংশ হিসেবে শিশুদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। যেখানে ফলো-আপ কেয়ার চলতে থাকে। ৩০ দিন বয়সে ফলো-আপে দেখা যায়, পাঁচ শিশুরই ওজন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সকলেই সুস্থ রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত বিরল ও চ্যালেঞ্জিং একটি ঘটনা।
বিএমইউ উপাচার্য এ ঘটনাকে বিএমইউর বিরাট সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অবস এ্যান্ড গাইনি বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং নিওন্যাটোলজি বিভাগের চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসক-নার্সদের দক্ষতা প্রশংসা করেন।
নিওন্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান জানান, মাল্টিপল জেস্টেশনের কারণে গর্ভাবস্থাটি শুরু থেকেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট ও অপরিণত অবস্থার কারণে শিশুদেও এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। জন্মের সময় শিশুদের ওজন ছিল যথাক্রমে ১৪২০ গ্রাম, ১২৫০ গ্রাম, ১৪১০ গ্রাম, ৯৮৫ গ্রাম এবং ১৬২৫ গ্রাম। এদের মধ্যে কয়েকজনের ওজন ছিল অত্যন্ত কম। জন্মের পর দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, বুক দেবে যাওয়া ও গ্রান্টিং-এর মতো শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়।
তিনি জানান, শিশুদের চিকিৎসায় শুরু থেকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা, সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার কেএমসসি চালু করা এবং দ্রুত সুস্থতার ভিত্তিতে পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের ওপর। পাঁচটি শিশুকেই জন্মের পরপর সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া হয়। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে খাবার বৃদ্ধি এবং মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের শ্বাসকষ্ট কমে আসে। জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা নবজাতকদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এনআইসিইউ সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে পরিবারকেও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস অনুসরণ করায় সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।
নবজাতক বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল হলে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার শুরু করা হয়। মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শে রাখার এই পদ্ধতি শিশুদের ওজন বৃদ্ধি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মা-শিশুর বন্ধন উন্নত করতে সহায়তা করেছে।
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের মধ্যেও সময়মতো এনআইসিইউ কেয়ার, বুকের দুধ খাওয়ানো, সিপ্যাপ ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার নিশ্চিত করা গেলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রিম্যাচিউর নবজাতকদেরর সফলভাবে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
এএস