অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর ধরনও বদলেছে, অল্প জ্বরেই যেতে হচ্ছে হাসপাতালে। ডেঙ্গু ও বয়স্কদের বার্ধক্য নিয়ে আজ আমরা হ্যালো ডাক্তার বিভাগে কথা বলব মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও জেরিয়াট্রিশিয়ান ডা. মো. আশরাফ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—এন আই মানিক
প্রশ্ন : এ বছর ডেঙ্গুর ধরন বা উপসর্গে কি কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে?
উত্তর : জি, এই বছর ডেঙ্গুর উপসর্গগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিবছর আমরা দেখতাম যে, শুরু থেকেই ডেঙ্গু জ্বরের তাপমাত্রা বেশি থাকত। ১০২ বা ১০৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকত। সঙ্গে প্রচণ্ড গায়ে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা—এগুলো সাধারণ উপসর্গ। কিন্তু এই বছর যেটা দেখা যাচ্ছে, ডাক্তারের ভাষায় আমরা এটাকে বলি ‘লো গ্রেড ফিভার’। ১০০ ডিগ্রি বা ১০১ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকে, যেটা আমরা অনেক সময় প্রথম দিকে ইগনোরই করি। এ ধরনের জ্বর নিয়ে এখন রোগীরা আসছে। সঙ্গে তীব্র গায়ে ব্যথার যে উপসর্গ ছিল, সেই উপসর্গগুলো থাকছে না। কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পাচ্ছি লুজ মোশন সমস্যা, যেটাকে আমরা বলি পাতলা পায়খানা। এ সমস্যা নিয়েও রোগীরা আসছে। সাধারণত অল্প জ্বর বা লুজ মোশন হলে আমরা বাসায় থাকার পরামর্শ দিই। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, যেহেতু লো গ্রেড ফিভার, সঙ্গে লুজ মোশন হচ্ছে, প্রথম দিকে কিন্তু ডায়াগনোসিস হচ্ছে না। যখন রোগীদের ডায়াগনোসিস হচ্ছে, তখন অনেক রোগীই খারাপ অবস্থায় হাসপাতালে আসছে।
প্রশ্ন : ডেঙ্গু হলে কোন লক্ষণগুলোকে সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত মনে করতে হবে?
উত্তর : এটাকে আমরা বলি ডেঙ্গুর ডেঞ্জার সাইন। ডেঙ্গু কিন্তু সাধারণত একটা ভাইরাস জ্বর। ভাইরাস জ্বরের চিকিৎসা একেবারেই সিম্পল—বাসায় রেস্ট থাকতে বলি, বেশি করে তরল খাবার খেতে বলি, জ্বর হলে প্যারাসিটামল এবং অন্যান্য ব্যথার ওষুধগুলো এভয়েড করতে বলি। কিন্তু কিছু ডেঞ্জার সাইন আছে, যেটা দেখলে আপনাকে বুঝতে হবে যে এই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। শরীরের কোথাও থেকে যদি কোনো ধরনের রক্তপাত হয়, যেমন দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্ত আসতে পারে। প্রস্রাবের রঙ লাল হতে পারে, কালো পায়খানা হতে পারে, এর বাইরেও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কালো-লালচে ছোপ ছোপ হয়ে যেতে পারে স্কিনের মধ্যে। এছাড়া পেটে তীব্র ব্যথা হতে পারে, শ্বাসকষ্ট হতে পারে, পেটে পানি চলে আসতে পারে, ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে যদি কোনো প্রস্রাব না হয় বা প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কমে যায়, শরীর একেবারেই ফ্যাকাসে হয়ে যায়, হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় পড়ে যায়, ব্লাডপ্রেশার খুব বেশি কমে যায়, অতিরিক্ত বমি হয়—এ ধরনের লক্ষণকে কিন্তু ডেঙ্গুর ডেঞ্জার সাইন বলি। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই অবশ্যই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
প্রশ্ন : জ্বরের কত দিন পর ডেঙ্গু পরীক্ষা করা প্রয়োজন?
উত্তর : মূলত তিনটা পরীক্ষা করি আমরা ডেঙ্গুতে। NS1 অ্যান্টিজেন, অ্যান্টি-ডেঙ্গু অ্যান্টিবডি (আইজিজি ও আইজিএম) এবং সিবিসি। সাধারণত জ্বরের প্রথম দিন থেকেই আমরা এনএস১ অ্যান্টিজেন এবং সিবিসি করে নিতে পারি। এ সময় সিবিসি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পরে আমরা যে সিবিসি করব, ওটার প্যারামিটারের সঙ্গে কম্পেয়ার করে দেখা। এনএস১ অ্যান্টিজেন সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরের প্রথম চার দিনের মধ্যে পজিটিভ থাকে। পঞ্চম দিন থেকে এটা নেগেটিভ আসা শুরু হয়ে যায়। আর অ্যান্টিবডি যেটা আমরা পরীক্ষা করি, ডেঙ্গু আইজিজি, আইজিএম—এগুলো সাধারণত পাঁচ দিনের পরে পজিটিভ আসা শুরু হয়। সে ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত জ্বরের ষষ্ঠ বা সপ্তম দিনের পরে এটা করতে পারি।
প্রশ্ন : জেরিয়াট্রিক মেডিসিন কী
উত্তর : জেরিয়াট্রিক মূলত প্রবীণদের চিকিৎসাবিজ্ঞান। বয়স্কদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকে, এই সমস্যাগুলো নিয়ে যারা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, তাদের জেরিয়াট্রিশিয়ান বলা হয়। আর এ-সম্পর্কিত যে মেডিসিন, সেটাকে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বলি।
প্রশ্ন : একসঙ্গে অনেকগুলো ওষুধ খাওয়ার কারণে বয়স্কদের কী ধরনের ঝুঁকি হতে পারে?
উত্তর : জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের সবচেয়ে ভয়ের বিষয়গুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে পলিফার্মেসি। মানে, যদি একসঙ্গে অনেকগুলো ওষুধ খায়, তখন ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাব শরীরে দেখা যেতে পারে। কিছু ওষুধ একটা আরেকটার কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, আবার কিছু ওষুধ একটা আরেকটার কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই বিষয়গুলো ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হয়।
প্রশ্ন : বয়স্কদের পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা বা গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কীভাবে কমানো সম্ভব?
উত্তর : এমন যেন না ঘটে, সে জন্য আমরা কিছু উপদেশ দিয়ে থাকি। রোগী যে রুমটাতে থাকবে, সেই রুমটাতে যথেষ্ট আলো থাকতে হবে। একটা বেড সুইচ দিতে হবে। রোগীকে বলতে হবে, আপনি বিছানা থেকে নামার আগে বেড সুইচ দিয়ে লাইট জ্বালিয়ে তারপর নামবেন। আমাদের দেশে লুঙ্গি বা শাড়ি পরার প্রবণতা বেশি, তাই মেঝেতে পড়ে যায়। বিছানা থেকে নামার আগে লুঙ্গি বা শাড়ির কাপড়টা ঠিকমতো গুছিয়ে নামতে হবে। যারা ওয়াকার ব্যবহার করেন বা লাঠি ব্যবহার করেন, তারা রাতে শোয়ার সময় লাঠি বা ওয়াকারটা বিছানার পাশে রাখবেন, যেন সকালে ঘুম থেকে উঠে বা মাঝরাতেও ওটা নিয়ে হাঁটতে পারেন।