কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনযাপন, শেখার পদ্ধতি ও চিন্তাভাবনা। এআইয়ের অগ্রগতিতে যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও দক্ষতার ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য।
‘আই অ্যাম অ্যান এক্সপার্ট ইন এআই কনশাসনেস — হিয়ার’স হাউ দিস নিউ ইন্টেলিজেন্স ইজ নাউ শেপিং আওয়ার্স’ শীর্ষক নিবন্ধে এসব কথা লিখেছেন এআই নীতিবিদ ও দার্শনিক হেনরি শেভলিন।
বর্তমান সময়ে এআইয়ের বিকাশের গতি, বিস্তৃতি ও প্রভাব মানবজাতির অভিজ্ঞতায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মাত্র পাঁচ বছরেরও কম সময়ে এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন আগে দুই অঙ্কের সংখ্যার গুণ করতেও সমস্যায় পড়া প্রযুক্তি এখন গণিতের নতুন সীমা উন্মোচনে ভূমিকা রাখছে। একইভাবে, এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে মানুষের হাতের আঙুলের সংখ্যাও ভুল হতো; এখন বাস্তবসম্মত ভিডিও ও মানুষের মতো দেখতে চরিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলোকে আসল থেকে আলাদা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তবে এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এআই মানুষের শেখার ও চিন্তা করার ধরনও বদলে দিতে পারে।
শেখার ক্ষেত্রে সুফল ও ঝুঁকি
এআই ব্যবহারের মাধ্যমে শেখার গতি বাড়ানো এবং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। বিশেষ করে, মানুষের দক্ষতা ও নির্দেশনার সঙ্গে সমন্বয় করে এআই ব্যবহার করলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।
নাইজেরিয়ার বেনিন সিটিতে পরিচালিত একটি গবেষণায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে জেনারেটিভ এআইভিত্তিক শিক্ষকের সহায়তা দেওয়া হয়। শিক্ষকদের সহযোগিতায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা যে অগ্রগতি অর্জন করে, বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় দুই বছরের শেখার সমতুল্য।
তবে এআইয়ের ব্যবহার সব ক্ষেত্রে সমান সুফল বয়ে আনে না। এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মানুষের নিজস্ব দক্ষতা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০২৩ সালে তুরস্কের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শেখার ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় একদল শিক্ষার্থীকে পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছিল। অন্য দুই দল ব্যবহার করেছিল জিপিটি-৪-এর সাধারণ সংস্করণ এবং এমন একটি বিশেষায়িত সংস্করণ, যা সরাসরি উত্তর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিতের মাধ্যমে সমাধানের দিকে এগিয়ে দিত।
গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ জিপিটি-৪ ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের অনুশীলনী পরীক্ষায় নম্বর প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বই ছাড়া পরীক্ষায় তাদের ফল পাঠ্যবই ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল। গবেষকদের মতে, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এর একটি কারণ হতে পারে। তবে ইঙ্গিত দিয়ে শেখানো বিশেষায়িত এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল দেখা যায়নি।
সৃজনশীলতাও কি একরকম হয়ে যাচ্ছে?
এআইয়ের আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার ওপর এর প্রভাব। ২৯৩ জন লেখককে নিয়ে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় কিছু লেখককে এআইয়ের দেওয়া গল্পের ধারণা ব্যবহার করতে বলা হয়। পরে দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তা পাওয়া গল্পগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি সৃজনশীল বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে, আগে যারা কম সৃজনশীল ছিলেন, তাদের লেখায় উন্নতি বেশি দেখা যায়। তবে একই সঙ্গে গল্পগুলোর মধ্যে মিলও বেড়ে যায়। অর্থাৎ, এআই ব্যক্তির সৃজনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করলেও সামগ্রিকভাবে সৃষ্টিশীল কাজের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে পারে।
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা নতুন নয়
নতুন প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তি ও স্মৃতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, এ নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোও লেখার প্রচলন মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। প্লেটোর ফেড্রাস সংলাপে সক্রেটিসের মুখে লেখার আবিষ্কার নিয়ে একটি কাহিনিতে সতর্ক করা হয়েছিল, লেখার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে মানুষ নিজের স্মৃতির বদলে বাইরের লিখিত তথ্যের ওপর বেশি ভরসা করতে পারে।
তবে লেখার কারণে মানুষের চিন্তাশক্তি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং লেখার প্রচলন মানুষের জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিকাশের পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন ধ্রুপদি সাহিত্য গবেষক মিলম্যান প্যারি বলকান অঞ্চলে দক্ষিণ স্লাভিক কবিদের মৌখিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি দেখেছিলেন, অনেক কবি লিখতে না জানলেও হাজার হাজার পঙ্ক্তির দীর্ঘ কবিতা স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করতে এবং প্রতিবার নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন।
কোনো দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমে গেলে সময়ের সঙ্গে সেই দক্ষতাও হারিয়ে যেতে পারে। প্রযুক্তি মানুষকে আরো বেশি কাজ করতে এবং নতুনভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে। কিন্তু এর বিনিময়ে পুরোনো কিছু জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়, যা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
মানুষের বিবর্তনেও প্রযুক্তির ভূমিকা
মানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এমন পরিবর্তন বহুবার ঘটেছে। আগুনের ব্যবহার ও রান্নার প্রচলন মানুষের পূর্বপুরুষদের কম খাবার থেকে বেশি শক্তি পেতে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ সময়ে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষের দাঁত, চোয়াল ও পরিপাকতন্ত্রের গঠনে পরিবর্তন এসেছে।
একইভাবে, কৃষিকাজের প্রসার মানুষের পক্ষে আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া সম্ভব করেছে। তবে এর ফলে প্রকৃতির বিভিন্ন উদ্ভিদ, ভেষজ, মাশরুম ও বেরির মধ্যে কোনগুলো খাওয়ার উপযোগী—সে সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কমেছে।
পড়ার অভ্যাসও মানুষের মস্তিষ্কে পরিবর্তন এনেছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী স্তানিসলাস দ্যানে ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, পড়তে শেখার ফলে মস্তিষ্কের দৃশ্য-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার একটি অংশ লিখিত শব্দ শনাক্ত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। এর বিনিময়ে মুখ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ওই অংশের প্রতিক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তন আসতে পারে।
দার্শনিক অ্যান্ডি ক্লার্কের বক্তব্য অনুযায়ী- মানুষ স্বভাবগতভাবেই এমন এক প্রাণী, যে নিজের সক্ষমতাকে বাইরের উপকরণ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্প্রসারণ করে। মানুষের মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতা এবং সংস্কৃতির নমনীয়তা এই বৈশিষ্ট্যেরই প্রকাশ।
এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ব্যবহারের ওপর
পৃথিবীর অন্য কোনো প্রজাতি মানুষের মতো নিজেদের জীবনযাপন ও পরিবেশকে এত ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করতে পারেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তিও সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে যেমন অপরিচিত ও নতুন ধরনের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের নিজের দক্ষতা ও চিন্তাশক্তির সম্প্রসারণের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।
তুরস্কের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা গবেষণার ফল দেখিয়েছে, সরাসরি উত্তর দিয়ে দেওয়া এআই এবং শিক্ষার্থীকে নিজে সমাধান খুঁজতে সাহায্য করা এআইয়ের প্রভাব এক নয়। এ থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তির নকশা ও ব্যবহারপদ্ধতি মানুষের শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মানবজাতি এখন ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য কী ধরনের সুফল ও ক্ষতি বয়ে আনবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে পরিবর্তনের সামনে মানুষ অসহায় নয়। নিজেদের ও চারপাশের পৃথিবীকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতাই মানুষের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য।