২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি—এই দিন চালু হয়েছিল মানুষের যোগাযোগ, সম্পর্কের ধরন পাল্টে দেওয়া ফেসবুক। আজ যে ফেসবুক ছোট-বড় নির্বিশেষে সবার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, জন্মদিনের শুভেচ্ছা থেকে শুরু করে নিজের ভাবনা প্রকাশের প্রধান মঞ্চ—তার যাত্রা শুরু হয়েছিল একদম সাধারণ ছাত্রাবাস থেকে। ফেসবুকের জন্মদিন এলেই মানুষের মনে জাগে নানা প্রশ্ন—কে বানাল এই মাধ্যম, কীভাবে শুরু হলো আর কীভাবেই বা এত অল্প সময়ে পুরো পৃথিবীকে নিজের ভেতর টেনে নিল? সেই কৌতূহলের উত্তর খুঁজতেই ফিরে যেতে হয় দুই দশক পেছনে। ফেসবুকের নেপথ্য কারিগর মার্ক ইলিয়ট জাকারবার্গ। ১৯৮৪ সালের ১৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের হোয়াইট প্লেইনসে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছিলেন একজন মেধাবী কম্পিউটার প্রোগ্রামার। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময়ই তার মাথায় জন্ম নেয় এমন একটি প্ল্যাটফর্মের ভাবনা, যেখানে মানুষ নিজের ছবি, পরিচয় একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবে। সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে তার পাশে ছিলেন সহপাঠী এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন, এন্ড্রু ম্যাককলাম, ডাস্টিন মস্কোভিটজ ও ক্রিস হিউজ।
তবে ফেসবুকের গল্প একদিনে শুরু হয়নি। ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর মার্ক জাকারবার্গ তৈরি করেছিলেন ‘ফেসম্যাশ ডটকম’ নামের একটি ওয়েবসাইট। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ডেটাবেস থেকে শিক্ষার্থীদের ছবি নিয়ে সেখানে ‘হট’ বা ‘নট’ ভোটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। যদিও এই সাইটটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, একই সঙ্গে তৈরি করে বিতর্ক। শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত ‘ফেসম্যাশ ডটকম’ বন্ধ করতে বাধ্য হন জাকারবার্গ। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাই তার মাথায় বপন করে দেয় আরো বড় কিছুর বীজ। সেই বীজ থেকেই ২০০৪ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি কিনে নেন ‘দ্য ফেসবুক ডটকম’ ডোমেইন। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ‘দ্য ফেসবুক’। অবাক করার মতো বিষয়—সাইট চালুর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ১২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী এতে নিবন্ধন করে। শুরুতে এটি শুধু হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও দুই মাসের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে বোস্টনের অন্যান্য কলেজ, আইভি লিগ এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৪ সালের জুন মাসে এসে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখে আর বছরের শেষ নাগাদ তা ছুঁয়ে ফেলে ১০ লাখ। তখন অবশ্য শর্ত ছিল—ব্যবহারকারীর বয়স হতে হবে কমপক্ষে ১৩ বছর। আজকের মতো ছবি আপলোড, নিউজ ফিড, ওয়াল, ইভেন্ট কিংবা পেজ তখনো ফেসবুকের অংশ হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একে একে যোগ হতে থাকে নতুন সব ফিচার। ২০০৫ সালের আগস্টে মার্ক জাকারবার্গ ‘দ্য ফেসবুক’ নামটি সংক্ষিপ্ত করে রাখেন শুধু ‘ফেসবুক’। এই নামের ডোমেইন কিনতে তাকে খরচ করতে হয়েছিল প্রায় দুই লাখ মার্কিন ডলার। এরপর আর থেমে থাকেনি এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২০১২ সালে ফেসবুকের ব্যবহারকারী সংখ্যা পৌঁছে যায় ১০০ কোটিতে।
বর্তমানে মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুকের চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রক অংশীদার। পাশাপাশি তিনি মহাকাশযান উন্নয়ন প্রকল্প ‘ব্রেকথ্রু স্টারশট’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ড সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন। একটি বিতর্কিত ছাত্র প্রজেক্ট থেকে শুরু হয়ে আজ ফেসবুক হয়ে উঠেছে বিশ্বজুড়ে মানুষের সম্পর্ক, মতামত আর গল্প বিনিময়ের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল আঙিনা। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল, বেড়ে উঠেছিল এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে যেতে এখন ফেসবুক আমাদের জীবনের অংশ।